www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

মহাকাশে নতুন বিপ্লবেই রচিত হচ্ছে মানব প্রজাতির আরেক অধ্যায়



 অনিম আরাফাত    ২৬ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার, ৯:০৫   বিজ্ঞান বিভাগ


 আজ থেকে একদম ৫০ বছর আগে চাঁদে পা রেখেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং। চন্দ্রজয়কে বলা হয় মানব ইতিহাসের সবথেকে বড় অর্জনগুলোর অন্যতম। তার পরের কয়েক বছর আরো বেশ কয়েকটি অভিযান চলে চাঁদে। তারপর বিশাল এক সময়ের ব্যবধান। দীর্ঘদিন চাঁদে যায়নি মানুষ। তবে মানুষের মহাশূন্যে যাত্রা থেমে ছিল না কখনই। চন্দ্রজয় ছিল কেবল শুরু। এরপর এখন পর্যন্ত মোট ৫৭১ জন পৃথিবীর কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন। এর পেছনে শুধু জয়ের নেশাই নয়, পরবর্তীতে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সামরিকসহ নানা কারণেই মানুষ ছুটে গেছে মহাকাশে। কিন্তু আগামি ৫০ বছরেই রচিত হতে চলেছে মহাকাশে মানব প্রজাতির সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়। মহাকাশযাত্রার ব্যয় হ্রাস, উন্নত প্রযুক্তি ও চীনের উচ্চাকাঙ্খাই এই অধ্যায়ের রচনা করবে। একইসঙ্গে এই খাতে ব্যয় করার জন্য বিশ্বজুড়ে উদ্যোক্তাদের একটি নতুন প্রজন্মের উঠে আসাও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, মহাকাশে পর্যটন ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও দূর ভবিষ্যতে অন্য গ্রহে অভিবাসী হওয়ার পথকে আগামি ৫০ বছরেই মসৃণ করবে মানব জাতি। এরফলে পৃথিবীর ধনীদের জন্য মহাকাশে পর্যটণ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হবে। সরকারগুলোকে হটিয়ে মহাকাশ পরিণত হবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের স্থানে। কিন্তু এসব ঘটার পূর্বে অর্থাৎ আগামি ৫০ বছরের মধ্যেই মহাকাশের জন্য একটি সিস্টেম ও আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। এরমধ্যে যেমন থাকবে শান্তিকালীন সময়ের আইন, একইসঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্যও আলাদা আইন এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এতদিন ধরে মহাকাশে বিনিয়োগের বেশিরভাগই ছিল শুধু স্যাটেলাইট প্রযুক্তিকে ঘিরেই। যোগাযোগ ও সম্প্রচারখাতে পৃথিবীতে আমূল পরিবর্তনের কারণ মূলত এটাই। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। ভূরাজনীতি আর আগের মত সহজ নেই। এটি এখন গড়িয়েছে পৃথিবীর কক্ষপথেও। পৃথিবী থেকে তুলনামূলক কাছের কক্ষপথে মানুষ পাঠানোর পেছনে এটি একটি বড় কারণ। এদিকে, ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে চীন। তবে চীনের পূর্বেই ২০২৪ সালের মধ্যে আবারো চাঁদে মানুষ পাঠানোর দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। মহাকাশযাত্রার ব্যয় কমে আসায় এখন চাঁদে যাওয়া আগের যে কোনো সময়ের থেকে সহজতর। ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো মিশন শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যায়ের মধ্য দিয়ে সফল হয়েছিল। কিন্তু এখন কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচেই এমন মিশন সম্ভব। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মহাকাশ গবেষণায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসছে। ১৯৫৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মহাকাশে ব্যয় হওয়া প্রায় প্রতিটি ডলারই ছিল সরকারগুলোর খরচ করা। কিন্তু দিনদিন এ ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসছে। আগে বলতে গেলে পেন্টাগন ও নাসাই এই ব্যয় বহন করত। কিন্তু এখন ¯েপসএক্স বা এলন মাস্কের রকেট ফার্ম ২০১৮ সালেই ২১টি স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে। জেফ বেজোসের আমাজনও মহাকাশে বিনিয়োগ করছে। তারা দুটি বিষয়কে টার্গেট করে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমটি হল কাছের কক্ষপথগুলোতে স্যাটেলাইট প্রেরণ ও আর অপরটি হচ্ছে, ধনীদের জন্য মহাকাশ পর্যটন। আগামি বছরই দেখা যাবে যাত্রীবাহী মহাকাশযান যা পর্যটকদের ভরশূন্য পরিবেশের অনুভুতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। একইসঙ্গে পর্যটকরা কালো মহাকাশের মাঝে নীল পৃথিবীর বাকা হয়ে যাওয়া প্রান্ত দেখতে পারবে। যে সংস্থাটি এই ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে তার নাম ভার্জিন। তাদের দাবি, ২০২২ সাল নাগাদ তারা প্রতি বছর ১০০০ এডভেঞ্চারপ্রিয় ধনীকে মহাকাশে নিয়ে যেতে পারবে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই মহাকাশ থেকে বাৎসরিক ৮০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় সম্ভব হবে। আরো ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের চলাচল মানব সভ্যতার ধরণকেই বদলে দেবে বলে ধারণা করা হয়। এলন মাস্ক মঙ্গল গ্রহে সেটলার পাঠাতে চান। জেফ বেজোসের পরিকল্পনা মহাকাশে তৈরি ¯েপস স্টেশনে কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য শহর তৈরি করা। আর নীল আর্মস্ট্রং-এর চন্দ্রজয়ের ১০০ বছর পূর্তির আগেই এগুলো বাস্তবে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পৃথিবীতে মানব বসবাসের উপযোগী পরিবেশ এখন শেষ হতে চলেছে। আর কয়টি প্রজন্ম বিশুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে সেটির নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতির ধীর গতি ও বিষাক্ত রাজনীতি পৃথিবীর মানুষকে হতাশ করে তুলছে। মানুষ বিশ্বাস করে, এরইমধ্যে মানব প্রজাতির ভবিষ্যত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন সময়ে মহাকাশে মানব বিচরণ হয়ত বিশ্ববাসীকে কিছুটা আশাবাদী করে তুলবে। কিন্তু এটি চাইলেই বাস্তব হয়ে যাবে তা নয়। এই ভবিষ্যতে যেতে কিছু বাধাও রয়েছে। সবথেকে বড় সমস্যাটি হচ্ছে মহাকাশ নিয়ে কার্যকরি একটি আইন প্রণয়ন। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, মহাকাশ হচ্ছে সকল মানবজাতির নতুন আরেক প্রদেশ। তাই কেউ চাইলেই এর কোনো অংশের সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারবে না। আর এতে সৃষ্টি হয়েছে নানা দ্বন্দ্বের। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ব্যক্তিমালিকানাধীন যে কোনো কো¤পানি চাইলেই মহাকাশে ঘাঁটি বানাতে পারবে। এ নিয়ে বিরুদ্ধ মতও আছে অনেক দেশে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন এই ক্ষেত্রে একদমই অস্পষ্ট।

এরকম আরো কিছু বিষয় আগামিতে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধের কারণ হতে পারে। যেমন, চাঁদে থাকা বরফ কোন দেশ ব্যবহার করবে? মঙ্গলে যেসব সেটলাররা যাবেন তারা কি তাদের মত করে সেখানকার পরিবেশকে ব্যবহার করতে পারবেন? স্যাটেলাইটের মধ্যে সংঘর্ষ হলে কে দোষী হবে? পৃথিবীর চারদিকে ২০০০ এরও বেশি স্যাটেলাইট পরিভ্রমণ করছে। এছাড়া, মহাকাশে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে কমপক্ষে ৫ লাখ যন্ত্রাংশ বা মহাকাশ আবর্জনা। এগুলোর গতি ঘন্টায় ২৭ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। তাই ভয়াবহ কিছু ঘটে যাওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। আর এই অনিশ্চয়তাই ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্জয় ডেকে নিয়ে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে স্যাটেলাইটকে যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। ফলে অন্যান্য জাতিগুলোও স্যাটেলাইট বিধ্বংসী অস্ত্র মজুদে সচেষ্ট হচ্ছে। সবথেকে বড় ভয়ের বিষয় হচ্ছে মহাকাশে সামরিক কার্যক্রম নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক কোনো আইনই নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ক্রমাগত তাদের সামরিক স্যাটেলাইটের আধুনিকায়ন করে চলেছে। এগুলোকে আরো বেশি ধ্বংসাত্মক করে তোলা নিয়ে আছে দেশ দুটির মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতাও। এসব স্যাটেলাইটে যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক লেজার। আছে শত্রু স্যাটেলাইটের সিগন্যাল জ্যাম করে দেয়ার প্রযুক্তি। ফলে যে কোনো সময় কেউ অন্যকারো স্বার্থে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। যা বড় পরিসরে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে। এই ভবিষ্যতকে মাথায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে মহাকাশরক্ষী বাহিনী। ফলে জলে, স্থলে ও আকাশের পর এবার মহাকাশের জন্যও সামরিক বাহিনী আত্মপ্রকাশ করলো। বাস্তিল দিবসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও মহাকাশ বাহিনী গঠনের ঘোষণা দেন। মহাকাশকে সমরাস্ত্রের ভয়ানক পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত করা হবে মানবজাতির সবথেকে বড় ভুল। মহাকাশকে সকল মানুষের জন্য নিরাপদ ও উপকারী করতে প্রয়োজন একটি কার্যকর আইন। কিন্তু একইসময় আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর দেশগুলো সয়াবিন কিংবা স্টিল বার আমদানি-রপ্তানি নিয়েই একমতে পৌছাতে পারছে না। সেখানে মহাকাশে সকল রাষ্ট্র শান্তি বজায় রাখবে তা কি আসলেই আশা করা যায়? কিন্তু বিশ্ব হয়ত আরো ৫০ বছর সময় পাবে এই সমস্যাগুলো সমাধান করে সত্যিকার অর্থেই মহাকাশকে পৃথিবীর কল্যানে ব্যবহার করতে। এটি যদি সম্ভব হয় তাহলে তা হবে মানব ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর যদি আমরা এর সমাধানে ব্যর্থ হই তাহলে একসময় মহাকাশ হয়ে দাঁড়াবে পৃথিবীর জন্য সবথেকে বড় অভিশাপ।





All rights reserved www.durbinnews.com