www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

ভারত কি ভেঙে যাবে?



 ওমর শরীফ    ৯ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার, ১:৪৪   তৃতীয় চোখ বিভাগ


মুখোশের আড়ালে মুখ। নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে বলা কথাটা ধীরে ধীরে সত্য হতে চলেছে। হাতে দাগ থাকলে তা যে বেশি দিন লুকিয়ে রাখা যায় না তাতো আর মিথ্যা নয়। গুজরাটের ইতিহাসতো মুছে ফেলা যাবে না। তবে পুরো পৃথিবীটাই অদ্ভুত এক সময় অতিক্রম করছে। গণতন্ত্র এখন অনেকটা মৃত এক শাসন ব্যবস্থা। দেশে দেশে ট্রাম্প, বরিস, মোদিদের উত্থান। তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভারত রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে- ১. ধর্মনিরপেক্ষতা ২. গণতন্ত্র ৩. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। অনেক পর্যবেক্ষকই বলে থাকেন, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এরই মধ্যে ইন্তেকাল করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়েও সেখানে গোমূত্র এখন আলোচিত বিষয়। ধর্মনিরপেক্ষতার পর এখন মোদি-অমিত জুটি আঘাত হেনেছেন ভারতের রাষ্ট্র কাঠামোতে। এ আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ভারতের ভাঙন কি তবে শুরু হলো। দেশটির সাবেক মন্ত্রী চিদাম্মরম অত্যন্ত খোলাখুলিভাবেই বলেছেন, ভারতের ভাঙন শুরু হয়ে গেলো। কাশ্মীর কি আরেকটি ফিলিস্তিন হবে? উপমহাদেশে সংকটের মাত্রা কি বাড়বে। কাশ্মীরের নিপীড়ন-নির্যাতন কী চলতেই থাকবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের ভেতরেই আলোচিত হচ্ছে, গণতন্ত্রের কথা বলে কাশ্মীরিদের গণতান্ত্রিক অধিকারই কেড়ে নেয়া হয়েছে সবার আগে। কাশ্মীরের জনগন কী চায় তা একবারও জানতে চাওয়া হয়নি। তারা আশঙ্কা করছেন, এর প্রতিঘাত এতো বড় হতে পারে যে, ভাঙন দেখা দিতে পারে পুরো ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই।

অনুপম কাঞ্জিলাল যেমনটা লিখেছেন, কাশ্মীরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হচ্ছে,অথচ কেডে় নেওয়া হচ্ছে রাজ্যের স্বীকৃতি,রাজ্যের নাগরিককে নাগরিক থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে প্রজার স্তরে,কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের স্বাধীন চলা ফেরার পরিসর,স্বাধীন মত প্রকাশের যাবতীয় সুযোগ। কোন গণতন্ত্রের সূচনা এটা? আমরা ভুলে যাচ্ছি কাশ্মীর বাসীর কান্না শুনতে,তাদের যন্ত্রনা হাহাকারকে অনুভব করতে। কাশ্মীরের যে ছোট্ট শিশুটি সেনার বিরুদ্ধে তার প্লাস্টিকের গুলতি তাক করে ইট ছুঁড়েছিল,সেটা আসলে একটা বার্তা,ক্ষমতার আগ্রাসন ও নির্দয়তার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের আমজনতার ধিক্কার ও ঘৃনার বার্তা। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একমুখি ক্ষমতার আধিপত্য প্রয়োগের তাড়নাকে যারা জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম বলে ভাবছেন, তারা হয়তো মনে রাখতে পারছেন না, দেশ মানে কোন ভূখন্ড,নদী,পাহাড় পর্বত,পাথর নয় দেশ মানে দেশের মানুষ, সেই মানুষের দুঃখ যন্ত্রনা হাহাকার কান্নাকে স্পর্শ করতে না জানলে দেশ প্রেম মিথ্যে-ফাঁকি। মিথ্যে দেশপ্রেমের উন্মাদনা তৈরি করে ক্ষমতা ভোগ করা যায়, ভূখন্ড জয় করা যায় কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। কাশ্মীরকে জয় করতে তাই সেখানকার মানুষের হৃদয় জয় করা জরুরি,তাদের কান্না শোনা জরুরি।কাশ্মীরের মানুষের হৃদয় জয় করতে পারলে সেনা লাগবে না,গোলা বারুদ লাগবে না অন্তরের তাগিদই কথন কাশ্মীরবাসীকে চালিত করবে ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল স্রোতে। তবে ক্ষমতা কী কোন দিন হৃদয়-বিবেকের ডাক শুনতে পাবে! জানা নেই,কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে আপাতাত কাশ্মীর উপত্যকা আবার এক রক্তাক্ত উপাখ্যান তৈরিরই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাশ্মীরিদের বাদ দিয়ে ভারত সরকার শুধু কাশ্মীর পেতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে না কি ?

অন্যদিকে, সেমন্তী ঘোষ লিখেছেন, ৩৭০ ধারা ভাল না মন্দ, ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমতার তাতে কী সুবিধে অসুবিধে, সংবিধান ঠিক কী বলেছে, সংবিধান সংশোধন করতে গেলে কী করা উচিত কী অনুচিত, এই সব নিয়ে বিস্তর আলোচনা এখন। অথচ কাশ্মীর সমস্যা থেকে বিলকুল বাদ পড়ে গিয়েছে কাশ্মীর নিজে। এক দিকে যেমন কোনও আলোচনা না করেই, গণতন্ত্রকে সমীহ না করেই সংসদে সংবিধান সংশোধনের পথ হল, তেমন এও তো ঠিক যে সংসদে যদি বিরোধীরা আরও আলোচনা করার সুযোগ পেতেন, তাতেও মূল সমস্যাটা মিটত না। কাশ্মীর নিয়ে বাকি দেশে সবার মত সবাই শুনছি, কেবল কাশ্মীরিদের মুখ বেঁধে রাখা হয়েছে— এমন একটা ব্যঙ্গছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরছে। কী ভয়ঙ্কর সত্য এটা, বোধ হয় টেরও পাচ্ছি না। কেবল শাসক কেন, কাশ্মীরের কথা কাশ্মীরের কাছ থেকেই শুনতে হবে, এমন দাবিতে হইচই ফেলে দিতে কি দেখা গিয়েছে বিরোধীদেরও? সব মিলিয়ে এ বার কাশ্মীরিদের চোখের সামনেই উন্মোচিত কাশ্মীরিদের প্রতি ভারতের বিস্মৃতি, অবজ্ঞা, অবহেলা। শোনা যাচ্ছে কাশ্মীরে নতুন শিল্প-লগ্নির বন্দোবস্ত, ভিন্‌রাজ্যের লোকেদের সেখানে জমি কেনার সুবিধে ইত্যাদি। কাশ্মীরের মানুষ কি জানতেও পারছেন, ‘ভাইব্র্যান্ট কাশ্মীর’ বানানোর জন্য তাবৎ ভারত এমন উঠেপড়ে মেতেছে? এক সময় ঔপনিবেশিক শাসকরা আমাদের ভবিষ্যৎটা ছকে দিতেন। আজ কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ আমরা যে ভাবে ছকে দিচ্ছি, তাতে স্পষ্ট, কাশ্মীর আমাদের কাছে উপনিবেশেরই তুল্য।  তাই, যে গহ্বরের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তাকে বোজানো অসম্ভব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটাই কথা বলার থাকে। সৈন্যবাহিনী দিয়ে দমননীতি চালিয়ে কাশ্মীরকে চেপেচুপে রাখুন, যত দিন সম্ভব! নয়তো, সমাজতাত্ত্বিক প্রতাপ ভানু মেহতা যেমন বলেছেন— যে প্রক্রিয়ায় কাশ্মীরকে ভারতে ঢুকিয়ে আনা হল, তাতে কাশ্মীরের বাঁধন খুলে দিলে, কে জানে, গোটা ভারতেই কাশ্মীর ছড়িয়ে পড়বে কি না?

 

 





All rights reserved www.durbinnews.com