www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

অন্য আলো



 শরিফা আক্তার    ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ৫:০২   সাহিত্য বিভাগ


যা হবার কথা ছিল তা আর হয়ে ওঠেনি। যৌবনের উন্মাদনায় একজন প্রেমিক যখন প্রেমিকার খুব কাছে আসে তখন এক ধরণের শৈল্পিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। হানিফ ভাই ফ্ল্যাটের চাবি অপুকে দিয়ে বলেছিল, অরুণাকে নিয়ে নিভৃতে সময় কাটাতে পারিস। অরুণাকে নিয়ে অপু একটু নিভৃতে একান্তে সময় কাটাতে এসেছিল। নির্জন ও দরজাবন্ধ স্থানে একজন আরেকজনের এত কাছে আসার পর যখন একজনের ঘাড়ে আরেকজনের শ্বাস প্রশ্বাস খুব গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে মনে হচ্ছিলো এখনই কোন প্রলয় ঘটবে। ঠিক তখনি দু’জন সম্বিৎ ফিরে পেল। দু’জনেই একটু দূরে সড়ে দাঁড়ালে না এমন হবার কথা ছিলনা। তাহলে দু’জনের যে পণ ছিল একটা বিশুদ্ধ সম্পর্কের পরই দু’জন দু’জনের খুব কাছে যাবে। এরপর অপরিপক্ব মনের প্রতি কটাক্ষ করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো তারা। ওরা বুঝলো বন্ধ দরজার চেয়ে খোলা প্রান্তর অনেক ভাল।
ঢাকা শহরে থাকে অরুণা। অপু থাকে শহর থেকে অনেক দূরে। অন্য শহরে। শুধুমাত্র ঢাকা শহরটা অনেক বেশী আপন অরুণার জন্য। এভাবে তাদের সম্পর্ক চার বছর ধরে চলছিলো। টানাপড়েনের সংসারে অরুণাকে গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি অপুর পক্ষে। কিন্তু তাদের দু’জনেরই একসঙ্গে থাকার অপেক্ষা যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগলো। তৃষ্ণার্ত, আহত, ছটফট পাখীর মত বহু কষ্টে সীমানা পেরিয়ে অপু চলে আসতো এই শহরে অরুণার কাছে। একটু দেখার জন্য। একটু সময় কাছে থাকার জন্য। মনে হতো অপুর বুক জুড়ে যে তৃষ্ণা তা নিবারণের জন্য ছোট্ট একটু সরোবর যেন অরুণা। খুব সন্তর্পণে সময় বের করে ওরা চলা যায় দূরে একটু নির্জনে। এই আসা যাওয়া, কিছু সময় পাশাপাশি বসে থাকা আর ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলোর মালা গেঁথেই যেন চলছিলো সময়। আবার মাঝে মাঝে বেশ দীর্ঘ সময় দেখা হতোনা তাদের। দু’জনেই দেখার বিকল্প চিঠি যেন যোগাযোগ রক্ষা করছিল। তাতে অনেক কথাই হতো দু’জনের। শুধু নিজেদের নয় সকল বিশ্বের খবর যেন চিঠির পাতা জুড়ে থাকতো। অরুণা মনে করে চিঠি একটা অদ্ভুত বিষয়। যখন মনে পড়ে তখনি সে চিঠি পড়ে নিতে পারে। আরো অবাক বিষয়, চিঠি যতবারই পড়ে ততবারই নতুন নতুন অনুভূতির জন্ম দেয়। তাই চিঠি দু’জনের কাছে আরও একজন বন্ধুর মত। অরুণা লেখে, আচ্ছা অপু আমার কথা কি তোমার মনে পড়ে?

অপু বলে, মনে পড়ে সবসময়। আর মাঝে মাঝে মনে হয় পাগলা হাতির মত সকল বাঁধা বিপত্তি ভেঙ্গে ছুটে আছি তোমার কাছে। অথবা অপু লেখে, অরুণা বলোতো রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু , এই ধেনু শব্দের অর্থ কি?  অরুণা অভিধান দেখে লেখে দিতো- বাচ্চাসহ গাভী। নিজেদের চিন্তা চেতনা ও ভাল লাগা না লাগা নিয়ে চিঠির পাতা জুড়ে থাকতো কত কথা।  হঠাৎ অসময়ে অপু ফোন দিয়ে অপরপ্রান্তে উত্তেজনায় কাঁপছে। বুঝতে পারেনি অরুণা কেন এমন করছে সে। অপু গড়গড় করে বলেই চলছে, অরুণা আমাদের সকল বাঁধা শেষ হতে চলেছে। শীঘ্রই একটা বিশুদ্ধ সম্পর্ক তোমার কথা মত হতে চলছে। আগামী সপ্তাহের প্রথমেই এসে আমি তোমার মা বাবার সঙ্গে কথা বলবো। আর পরের সপ্তাহে আমার বাবা আসছে ফাইনাল কথা বলতে। অরুণার উত্তেজনাও কম ছিলো না কোনো অংশে। সব কথা এক এক করে জড়িয়ে যাচ্ছিলো যেন।  আজ সপ্তাহের প্রথম দিন। সন্ধ্যার খবরে দেখলো সিলেট থেকে ঢাকাগামী একটি বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছে পাঁচজন। তারমধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে , অপুর নাম শুনতে শুনতে অরুণার কানের কাছে অসংখ্য ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এছাড়া আর কোন শব্দ সে শুনতে পাচ্ছেনা।

যখন সবার কথা শুনতে পাচ্ছে তখন সে দেখলো হাসপাতালের বিছানায়। নিজেকে তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় সম্বলহীন নিঃস্ব। এই জীবন থেকে চলে যাওয়ার কথা চিন্তা করছিল তাও পেরে উঠলো না। স্বাভাবিক জীবনে অরুণা আর ফিরে যেতে হয়তো পারবেনা। তাই সে চট্টগ্রামের একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতার বিষয়টি তার অবিভাবকদের সহায়তায় সিদ্ধান্ত নিলো যোগদান করার। চট্টগ্রামের টেনে উঠে অরুণা ভাবছে, এই জীবনে প্রিয়জনের একটু ছুঁয়ে যাওয়া শিহরণ কোনদিন আর পাবেনা। তবুও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য, তাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে তার না পাওয়ার বেদনাকে পাওয়াতে রূপান্তরিত করতে সে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে ।  অন্য আলোয় আলোকিত হবার জন্য।





All rights reserved www.durbinnews.com