www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

সাংবাদিকতার পেলে কিংবা পিসি সরকার



 দূরবীন ডেস্ক    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার, ৯:২৯   লাইফ বিভাগ


এবিএম মূসা। প্রয়াত এই কিংবদন্তি সাংবাদিককে আজও মিস করে বাংলাদেশ। ছিলেন সদা সরব। কখনও লেখায়, কখনওবা টিভি পর্দায়। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য। সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন।  কয়েকটি প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রতিনিধি ছিলেন এবিএম মূসা। তিনি তখন জীবিত। তাকে নিয়ে মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছিলেন, বাচ্চোকে বোলাও ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ঢাকায় নেমে একথা যাঁকে বলতেন তিনি তখনকার একজন তরুণ সাংবাদিক। টেলিভিশন বুঝতে হবে না, আমারে বুঝো তো, তাহলেই চলবো। পাকিস্তানি কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ১০ই জানুয়ারি। পরদিনই প্রেস সেক্রেটারি আমিনুল হক বাদশার মাধ্যমে ওই তরুণ, তখনকার পরিপক্ব যুবাটির তলব পড়লো।তোকে বিটিভির মহাপরিচালক হতে হবে। রাতারাতি তিনি মহাপরিচালক বনে গেলেন। কদিন বাদে বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমাকে ডুবন্ত মর্নিং নিউজের হাল ধরতে হবে। তিনি তা-ই ধরলেন। এলো ১৯৭৩। উপরের দুটি ঘটনা না হয় তাঁর আশৈশবের লালিত স্বপ্নের সিম্ফনির সঙ্গে একতারে বাঁধা ছিল। কিন্তু এবার তাঁর পিলে চমকালো। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোকে এবারে নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। ফেনী থেকে দাঁড়াবি। বিশ্বের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন রেকর্ড। আপাদমস্তক এক সাংবাদিক প্রার্থী হলেন। না, সাফল্য তাঁকে বিমুখ করেনি। হলেন সুনির্বাচিত আইনপ্রণেতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর হুমকির মুখে দেশ ছেড়েছিলেন। মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে পালালেন তিনি। প্রথমে কয়েকদিন গিয়ে বিএমডিসির সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক আবু আহমদ চৌধুরীর বাড়িতে লুকিয়ে থাকলেন। ছদিন বাদে পাড়ি জমালেন লন্ডনে। অসহায়, গিয়ে উঠলেন বন্ধুবর আবদুল গাফফার চৌধুরীর বাসায়। ৭৬ সালের শেষাশেষি ফিরলেন মাতৃভূমির টানে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের অনুরোধে ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন। ওই সময়ে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনেপ) ব্যাংকক আঞ্চলিক অফিসে রিজিওনাল ডিরেক্টর, ইনফরমেশন পদের জন্য যোগ্য লোক খুঁজছিল। বন্ধু এস এম আলী তখন ম্যানিলায় প্রেস ফাউন্ডেশন এশিয়ার পরিচালক (পরে ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক)। তাঁর ঐকান্তিকতায় ৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংককে গিয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের চাকরিতে। শুধু বেতনই ছিল দুই হাজার ডলার। হেড কোয়ার্টার ছিল কেনিয়ার নাইরোবিতে। ২৩টি দেশ নিয়ে কাজ করতে হতো তাকে। কোরিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত এসব দেশের বেশির ভাগই ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র। ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি ইত্যাদি চষে বেড়ান তিনি। এরই মধ্যে একবার ব্যাংককে গেলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর প্রেস এডভাইজার বন্ধু দাউদ খান মজলিশ তাঁকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর সঙ্গে। জিয়াউর রহমান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এখানে কি করছেন। সব শুনে মাথা নেড়ে বললেন, উহু, আপনি দেশে চলে আসুন। দেশে আপনার মতো লোকদের দরকার আছে। আড়াই বছর পরে জাতিসংঘের চুক্তিটি আর নবায়ন করলেন না তিনি। ওই বছরই প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ফের দেখা। জিয়াউর রহমান অবাক হলেন। তিনি যে দেশেই আছেন এটা তাঁর এই প্রথম জানা হলো। কদিন বাদেই দেখা গেল তিনি প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হয়ে গেছেন। পরে বাসস-এ। বিটিভি ও মর্নিং নিউজ-এর চাকরি যেভাবে পিআইবি ও বাসস-এর পদায়নও সেভাবে। ব্যবধান শুধু বঙ্গবন্ধু থেকে জিয়াউর রহমান। ব্যতিক্রম শুধু জেনারেল এরশাদ। তাঁর অনীহা ও চাপে তিনি ১৯৮৭ সালে বাসস থেকে অবসর নেন। এর তিন বছর না যেতেই বাংলাদেশ প্রবেশ করে দুই নেত্রীর শাসনপর্বে। আর তাঁকে দেখা যায় তিনি রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে। সংসদ নির্বাচন আর কোন দলের পদ-পদবি তাঁকে আর টানেনি। তিনি কার্যত পরিণত কিংবা আপনা-আপনি রূপান্তরিত হলেন এক অবিসংবাদিত কিংমেকারে। রাজনীতি তাঁর কলমে নতুন করে প্রাণ পায়, তাঁর কলম হয়ে ওঠে তুলি। ষাটের দশকেই মূসার নাম সীমান্ত পেরিয়ে ডানা মেলেছিল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার অঙ্গনে। দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি ছিলেন পরিচিত একটি নাম। বিবিসি, টাইমস, লন্ডন সানডে টাইমস ও দি ইকোনমিস্ট-এর মতো জাঁদরেল গণমাধ্যমে কাজের বিরল সুযোগ ঘটেছিল তাঁর। সেই সুবাদে সানডে টাইমস-এর প্রখ্যাত সম্পাদক (১৯৬৭-৮১) স্যার হ্যারল্ড ম্যাথিউ ইভান্সের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। দুজনে প্রায় সমবয়সী। ম্যাথিউ তাঁর চেয়ে বছর তিনেকের জ্যেষ্ঠ। ২০০৪ থেকে ম্যাথিউ গার্ডিয়ান ও বিবিসির একজন প্রদায়ক। যুদ্ধের পরে তিনি সানডে টাইমস, লন্ডন টাইমস ছাড়াও বিশ্বখ্যাত নিউ ইয়র্ক টাইমস ও লস অ্যানজেলেস টাইমসের সংবাদদাতা হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বেশি আনন্দ ও সুখ-স্মৃতি সানডে টাইমস ও টাইমসকে ঘিরে। আর তার মূল কারণ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের রিপোর্টগুলো জম্পেশ করে ছেপেছিলেন তারা। পত্রিকার সম্পাদক হওয়ার প্রতি তিনি নন, সম্পাদক পদই বারংবার তাঁর উপরে আছড়ে পড়ে। ৯১ সালে নিউজ ডে নামে একটি ইংরেজি দৈনিকে সম্পাদক হিসেবে কাজ করলেন বছরখানেক। এরপর ২০০৪ সালে ভাইয়া গ্রুপের তাগিদে নিত্যদিন নামে পত্রিকার ডিক্লারেশনের জন্য আবেদন করলেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তিনি বিমুখ হলেন। ক্ষুব্ধতা নিয়ে দোর বন্ধ না করে দোর খোলার লড়াইয়ে যুক্ত হলেন। জয়ী হলেন। প্রেস কাউন্সিল রায় দেন যে, ডিসি অনুমতি না দিলে তাদের রায়ই ধরে নিতে হবে ডিক্লারেশন। এটা একটা মাইলফলক ঘটনা। সংকোচ নিয়েও দীর্ঘ বিরতিতে ২০০৪ সালে যুগান্তরের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এদেশের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের নীরব সাক্ষী তিনি। ১৯৬৫ তে তাসখন্দ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যোগ দেন। কিন্তু তাদের শান্তি চুক্তির পরে ওই দিন রাতেই লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মারা যান। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৩টা। তিনি তখন অবজারভারের বার্তা সম্পাদক। বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। পত্রিকার এক সুপারভাইজার বেতারে খবর শুনে তাঁকে টেলিফোন করেন। ততক্ষণে নগর সংস্করণও ছাপা শেষ। তবু সংবাদের গুরুত্ব বুঝে তিনি অফিসে ছুটে এসে নগর সংস্করণ আবার নতুন করে ছাপলেন। প্রথম পাতায় তাসখন্দ চুক্তির ফিরিস্তি। আলাদা করে ছাপলেন শাস্ত্রীর মৃত্যুর খবর। ঢাকায় দ্বিতীয় নগর সংস্করণ বিলি হলো। ওই সংবাদ সেদিন উপমহাদেশে শুধু অবজারভারই দিতে পেরেছিল। জেনেভার ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) এজন্য তাঁকে পুরস্কার দিয়েছিল।১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ছাপার অপরাধে পাকিস্তান অবজারভার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তখন যোগ দেন সংবাদে। ৫২ থেকে ৫৪ সংবাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ ছিলেন। ৫৪-তে অবজারভার ফের প্রকাশিত হয়। সেখানে ফের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন। পরে রিপোর্টারও হন। এবারে পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম। তাঁর অন্যতম আইডল। তাঁর হাতেই তিনি ৫৭-র দিকে বার্তা সম্পাদক হন।পত্রিকার মেকআপ, গেটআপ বদলে দিতেও তাঁর ভূমিকা অসামান্য। ১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ প্রেস ইনস্টিটিউটের বৃত্তি নিয়ে লন্ডনে যান তিনি। সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেন অক্সফোর্ডে কুইন এলিজাবেথ হাউসে। ফিরে এসে অবজারভারের চেহারা পাল্টান। অনধিক ছয় হাজার সার্কুলেশনের অবজারভার ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানে বিক্রি হতো ১০ হাজার কপি। উল্লেখ্য, আজ স্বাধীন বাংলাদেশেও ইংরেজি দৈনিকের সার্কুলেশন কার্যত তাঁর ক্যারিশমাকে ছাড়িয়ে যায়নি বলা যায়। অবিভক্ত পাকিস্তানের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিকের রূপকার ছিলেন তিনিই। একাত্তর সাল পর্যন্ত অবজারভারের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি ইউনিয়নবাজিও তিনি কম করেননি। আইয়ুব খানের সঙ্গে পিন্ডিতে গিয়ে বৈঠক করলেন সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েই। ১৯৬২ সালে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অধ্যাদেশ নিয়ে ১৭ দিন সমগ্র পাকিস্তানে পত্রিকা বন্ধ ছিল। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টের জেনারেল সেক্রেটারি। আমাদের জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম তিনি। শুধু তাই নয়, বিশ্বে মেধাবী সাংবাদিকতার পাশাপাশি একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে তাঁর সুনাম আকাশ ছুঁই-ছুঁই। সেটা হয়তো গিনেস বুকের রেকর্ডের সঙ্গে তুল্য। জাতীয় প্রেসক্লাবের শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে বহুকাল আগে যে রেকর্ড গড়েছেন তা সহজে আর কেউ ভাঙতে পারবেন না। মানিক মিয়া জেলে বসে যখন প্রেসক্লাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট হন তখন তিনিও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি আমাদের সাংবাদিকতার পেলে কিংবা পিসি সরকার। জন্ম তার ১৯৩১ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি। ফেনীর পরশুরাম থানার ধর্মপুর গ্রামে। ওটা ছিল তার নানাবাড়ি। ছেলেবেলার উল্লেখযোগ্য সময় নানাবাড়িতেই কাটিয়েছেন। পিতা আশরাফ আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তবে ঘরের পরিবেশ কিংবা মায়ের অনুপ্রেরণা ১৯ বছরেই সাংবাদিকতায় আসতে তাকে সাহায্য করেছে। তিনি তার কলামের স্টাইলের জন্য তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, নিউজের জন্য সৈয়দ নুরুদ্দীন, কলাম লেখার জন্য মতিউর রহমান ও টিভিতে টকশোর জন্য মতিউর রহমান চৌধুরীকে স্মরণ করেন। তবে প্রবাসী বন্ধু ইভান্স তার বড় আইডল। দুই নেত্রীর জমানায় তিনি কোন পদ-পদবি নেননি। ওয়ান ইলেভেন নিয়ে তার কলাম-চিত্র প্রমাণ করে দেয় তিনি আমাদের জাতীয় কিংবদন্তি। তিনি আমাদের টানাপড়েন ও দলাদলির পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক আশ্চর্য চরিত্র।




 এ বিভাগের অন্যান্য


বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুই বারের উপজেলা চেয়ারম্যান


বৃটেনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজমুলের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের খবর


নাসায় নিয়োগ পেলেন সিলেটের মাহজাবিন


সাংবাদিকতার পেলে কিংবা পিসি সরকার


মানুষ কেন মিথ্যা না বলে থাকতে পারে না?


ডাবল স্ট্যান্ড করা রুবানা পড়ালেখার খরচ চালাতেন টিউশনি করে


ড্যানিয়েল যেভাবে আবদুল্লাহ হলেন


গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে যেতাম বিক্রি করতে


মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে ১২০০ শিশুকে খাইয়ে চলেছেন মইনুদ্দিন


কে এই রুবাবা দৌলা?


ডেঙ্গু নিরাময়ে পেঁপে পাতার রস কি আসলেই কার্যকর?


ট্রাম্পকে বাংলাদেশ চেনানো হবে, তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে ৬৪ জেলায়


উচ্চ রক্তচাপ?


অধ্যাপক আ ব ম ফারুক, আপনাকে সালাম জানাই


২৪ জনের মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হলো, কেবল জ্যাক মারই হলো না





All rights reserved www.durbinnews.com