www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

স্বৈরশাসক থেকে কিংমেকার



 দূরবীন ডেস্ক    ১৯ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার, ১১:০৫   রাজনীতি বিভাগ


বাংলাদেশের সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১৪ই জুলাই ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ সব থেকে আলোচিত ব্যক্তিদের একজন। তার অনেক সহকর্মীই অস্বাভাবিক মৃত্যুরৃ শিকার হয়েছেন আবার অনেকেরই জীবনের বড় অংশ কেটেছে জেলে। তাই তার আত্মগরিমাপূর্ণ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষে বৃদ্ধ বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুও অনেকের কাছে ছিল অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু এরশাদকেই স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ ১৯৫০ সালের পর থেকে নিশ্চিতভাবেই আরো অনেক স্বৈরশাসক দেখেছে বাংলাদেশ। দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা প্রায়ই এরশাদকে ১৯৮২ সালে মার্শাল ল জারির মাধ্যমে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রকে ধ্বংসের জন্য দায়ী করে থাকেন। কিন্তু দেশের তরুণ প্রজন্ম এরশাদকে দেখে অন্যভাবে। তাদের কাছে জেনারেল এরশাদ নিছক এক রাজনৈতিক সুবিধাবাদী ব্যক্তি যাকে কখনই বিশ্বাস করা যায় না। এ প্রজন্মের কাছে এরশাদ হলো সেই ব্যক্তি, যার নিজের ক্ষমতায় যাওয়ার শক্তি নেই কিন্তু অন্যকে ক্ষমতায় বসাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৩০ সালে বৃটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্ম গ্রহণ করেন এরশাদ। ১৯৪৮ সালে তার পরিবার বর্তমান বাংলাদেশে চলে আসে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং শিগগিরই কর্মদক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল তখন তিনি নিরাপদে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। স্বাধীনতার ২ বছর পর ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এরশাদকে তার সেনাবাহিনীর প্রধান ঘোষণা করেন। কী কারণে এরশাদকে এত বড় পদে বসানো হলো তা সেসময় অনেকের কাছেই অস্পষ্ট ছিল। জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় এরশাদ সবসময় তার প্রতি অনুগত ছিলেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচন আয়োজন করেন। শাসক দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সহজেই সে নির্বাচনে জয় পেয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আব্দুস সাত্তার। কিন্তু নিজের শেষ বয়সে হঠাৎ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তিনি জনগণ ও সামরিক বাহিনীর বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হন। ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগান এরশাদ। এক বিদ্রোহের মাধ্যমে আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেন তিনি। ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় বসার পর রাজনীতিতে পারিবারিক পরিচয় ও তার প্রতি জনগণের আস্থা না থাকায় জেনারেল এরশাদ দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার পূর্ববর্তী শাসক জিয়াউর রহমানের মধ্যপন্থী নীতি গ্রহণ করেন। জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য জিয়াউর রহমানের মতো তিনিও বাংলাদেশকে ক্রমাগত ইসলামীকরণের দিকে ঠেলে দেয়ার কৌশল অবলম্বন করেন। মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সচেষ্ট হন তিনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। একজন ইসলামপন্থী শাসক হিসেবে তিনি ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন। একইসঙ্গে কবিখ্যাতি কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক এলিটদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এরশাদ। যখন তিনি একটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তাকে অন্য প্রধান দলগুলো থেকে নেতা টেনে আনতে হয়েছিল। কারণ, তার নিজের রাজনৈতিক মূলধন বলতে কিছুই ছিল না। চীনপন্থী মাওবাদীসহ বিভিন্ন মতাদর্শের নেতাদের তিনি প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। ১৯৯০ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে থাকা বিএনপির সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ।কিন্তু পরে  বাংলাদেশে সুশাসন প্রশ্নে ইতিবাচক তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতা থেকে সরানোর পর এরশাদকে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখান থেকেই তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয় লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেন। সেসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের যে ৫ আসন ঘাটতি ছিল তা পূরণ করে জোট সরকার গঠন করেন। উল্লেখ্য, সেসময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই এরশাদকে জোট গঠনের মাধ্যমে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করেছিল। যাকে তারা ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়েছিল তার সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রধান দুই দলের এমন অনুরোধ এরশাদকে শুধু রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেনি, একইসঙ্গে এরশাদ রাজনীতির মাঠে নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণের প্রধান ঘুঁটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এরশাদ হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের কিংমেকার। ১৯৯৭ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। এর পরবর্তী বছরগুলোতে এরশাদকে দলবদলের জন্য বারবার অনুরোধ করেছে বিএনপি। এ বিষয়টি সবথেকে বেশি আলোচিত হয় ২০১৩ সালে। এরশাদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন ও বৃদ্ধ বয়সে একাধিক প্রেমের সম্পর্ক তাকে জনগণের কাছে হাসির পাত্র করে তোলে। কিন্তু তার ধূর্ত ও সুবিধাবাদী রাজনীতি ৪ দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভুগিয়েছে। সবশেষে এরশাদ প্রমাণ করেছেন, রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রশ্নে তিনি একজন কিংবদন্তি। প্রথমে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে এবং পরে একজন কিংমেকার হিসেবে।

 




 এ বিভাগের অন্যান্য


নেত্রী বলেছেন আসেন, আবার এসে গেলাম


জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খোকা


এবার ইবি ছাত্রলীগ নেতার চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস


রাজনৈতিক দলের কোনো ধর্ম থাকতে পারেনা: মঞ্জু


যে গোয়েন্দা রিপোর্টে শোভন-রাব্বানীর ভাগ্য বিপর্যয়


কাদের না রওশন: জাপার চেয়ারম্যান আসলে কে?


নতুন জামায়াতের আমির হতে পারেন মিয়া গোলাম পরওয়ার


জামায়াতের সংস্কাপন্থীদের উদ্যোগে সাড়া নেই


কামাল-ফখরুল কি আতাত করে বিএনপিকে ভোটে রেখেছিলেন?


নিউজার্সি স্টেট বিএনপির কমিটি গঠিত


স্বৈরশাসক থেকে কিংমেকার


নতুন দলে যোগ দিতে রাজি হননি রাজ্জাক ও মাহমুদুর রহমান


জাপা কি দুই ভাগ হয়ে যাবে?


যে কারণে সংস্কার বা নতুন দল নিয়ে আগ্রহ নেই জামায়াতে


এরিক কি তার বাবাকে দেখতেও পাবে না?





All rights reserved www.durbinnews.com