www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

মানুষ যেমনই হোক, টাকা অথবা ক্ষমতা থাকতে হবে- এই শেখায় আমাদের পরিবারগুলো



  লোপা হোসাইন    ২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার, ২:৪৮   তৃতীয় চোখ বিভাগ


চারপাশে আর তাকাতে ইচ্ছে হয়না৷ চোখ,কান খুলতে মন চায়না৷ কিছু বলতেও ভালো লাগেনা। মনুষ্যত্ব বলে যে একটা শব্দ আছে,সে শব্দের অর্থই মনে হয় আমরা ভুলে গেছি। ‘মনুষ্যত্ব’ হল সেইসব বৈশিষ্ট যা একজন মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। অথচ সেই মনুষ্যত্বের চিহ্নগুলোই এখন কষ্ট করে খুঁজতে হয় মানুষের মধ্যে৷ যে বৈশিষ্টগুলো মানুষের মাঝে থাকাই স্বাভাবিক, সেগুলো এখন কোন মানুষের মধ্যে পেলে আমরা তাকে অসাধারণ, মহান, ফেরেশতার মত মানুষ বলে আখ্যায়িত করতে থাকি৷ আমাদের নৈতিক অবক্ষয় বাড়তে বাড়তে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে,যে সমাজ একটু একটু করে দখলে নিয়ে নিচ্ছে মানুষের মত দেখতে পশুরা। এভাবে চলতে থাকলে যে অল্প সংখ্যক মানুষ আছেন, তারাও হয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের অজান্তেই মনুষ্যত্ব খুইয়ে পশুত্ব বরণ করবেন।

সমাজের এই অধপতনের জন্য মূলত দায়ী কারা জানেন? আমাদের বাবা-মায়েরা,অভিভাবকরা ৷ প্রায় ৯৫% বাবা মায়েরা ছেলেমেয়েদের ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শেখান। সেই সাথে শেখান হিংসা, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, আর্থ-সামাজিক বিভেদ, পরমত অসহিষ্ণুতা, নারীর প্রতি বিদ্বেষ সহ আরও অনেক নেতিবাচক বিষয় যা শিশু কিশোরদের ভাবনার জগৎটাকে বিষাক্ত করে তোলে। যে সন্তান তার বাবা মা কে দেখে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাতে তার জন্য টাকা দিয়ে প্রশ্নপত্র কিনতে, সে তো এটাই শিখবে যে সফল হওয়াই একমাত্র পথ। সে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন। কয়জন মা তার সন্তানকে শেখান যে নারীকে কেন এবং কিভাবে সম্মান দেখাতে হবে? যে ছেলে কখনো তার বাবা মায়ের কাছ থেকে নারীর প্রতি সম্মান দেখানো শেখেনি, যখন পরিবার থেকেই বুঝিয়ে দেয়া হয় যে পুরুষই হল সুপ্রিম পাওয়ারের অধিকারী এবং নারী থাকবে তার অধীনে, সেই ছেলে তো মেয়েদের পণ্য ভাববেই। এরকম পরিবারের ছেলেরাই ধর্ষক হয়, নারী নির্যাতনকারী হয় ৷ যেসব পরিবারে ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক মেলামেশাটাই অস্বাভাবিক, নারীর প্রতি তাদের আকর্ষণের ধরণও হয় অস্বাভাবিক। এইভাবে বেড়ে ওঠা পুরুষদের চোখই নারী শরীর আর শিশুর শরীর একইরকম নোংরা ভাবে দেখে৷ যে মেয়েদের শেখানো হয় যে সুন্দরী হওয়া এবং একটা "টাকাওয়ালা জামাই" জোটানোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য, সে যত লেখাপড়াই করুক না কেন ,মন টা তার অসুন্দর, অনুদার আর হিংসুক থেকে যাবে। ছেলেদের শেখানো হয় তার সাফল্য আছে টাকা এবং ক্ষমতা অর্জনে। পুরুষ শক্তিশালী, তাই তারাই কর্তৃত্ব দেখানোর অধিকারী। যেসব বাবা মায়েরা লেখাপড়া করে পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া ছাড়া সন্তানের সামনে আর কোন লক্ষ্য, স্বপ্ন বা বিকল্প রাখেননা, এরাই পরীক্ষায় পাস না করতে পারলে, জিপিএ ৫ না পেলে হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করে... যেকোনো উপায়েই হোক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার- সরকারি চাকুরে হতেই হবে। যেকোনো উপায়েই হোক ছেলেকে প্রচুর টাকা কামাই করতেই হবে। ক্ষমতাবান হতেই হবে। যেভাবেই হোক মেয়েকে সুন্দরী হতেই হবে এবং পয়সাওয়ালা কারও সাথে বিয়ে দিতেই হবে। টাকা না থাকলে সুখ নাই, সম্মান নাই। মানুষ যেমনই হোক, টাকা অথবা ক্ষমতা থাকতে হবে - এই শেখায় আমাদের পরিবারগুলো। সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে ছেলেমেয়েদের দেখানো হয় কেবল ধনী আর ক্ষমতাবান মানুষদের। ‘ভালো মানুষ’  হবার শিক্ষা দেয়া হয় কয়টা পরিবারে? কয়টা পরিবার সন্তান কে শিক্ষকতা করতে উৎসাহ দেয়?

যেসব পরিবার সন্তানদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে, খেলাধুলা বা অন্যান্য সামাজিক সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত করেছেন,সেসব পরিবারে খুন, ধর্ষণ, মানুষ পিটিয়ে আহত করা বা পশুপাখি পিটিয়ে মেরে ফেলার মত ঘটনা দেখাতে পারবেন? বাবা মায়েরা সন্তানদের ভালো মানুষ হতে উৎসাহিত না করে কেবল সফল হবার চাপ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সুপ্রবৃত্তিগুলো একটু একটু করে ধ্বংস করে দেন। মনের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ ঢুকিয়ে তাদের কোমল মনটাকে করে দেন পাথরের মত শক্ত। সন্তান অপরাধ করলেও তাকে না বুঝিয়ে বা শাস্তি না দিয়ে উল্টো তাকে ডিফেন্ড করে আরও খারাপ কিছু করতে এগিয়ে দেন নিজের অজান্তেই। এই যে শিশুদের প্রতি হিংস্রতা,ধর্ষণ,খুন, দুর্নীতি,আইন না মানা, সামান্য কারণে অথবা সন্দেহের বশে মানুষ পিটিয়ে মেরা ফেলা এই সবই আমাদের Abnormal Socialization বা অস্বাভাবিক সামাজিকীকরণ এর কুফল।

এই সামাজিক দুর্যোগ কেবল আইনের প্রয়োগ দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব না । এই অবক্ষয় রোধ করতে পারেন আমাদের বাবা মায়েরা৷ প্রাতিষ্ঠানিক এবং ধর্মীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত বাবা মায়েরা সন্তান কে যতক্ষণ একইভাবে শিক্ষিত এবং নৈতিক হবার শিক্ষা না দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অসুস্থ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি নেই৷ সরকার আর রাজনীতিবিদদের গালি দিয়ে ‘এই বাংলাদেশ আমার নয়’ মার্কা দায়িত্ব এড়ানো ডায়লগ দিয়ে লাভ নেই৷ কারণ যারা রাজনীতি করেন, তারাও মানুষ এবং তারাও বেশীরভাগই অস্বাভাবিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন। তাইতো কোন এক এমপি সাহেবের মনে হয়েছে যে পার্কে বসে তরুণ তরুণীদের প্রেম করা ঠেকালেই সমাজের অধপতন ঠেকানো যাবে।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)

 





All rights reserved www.durbinnews.com