www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ



 মনিজা রহমান    ২৫ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১০:২৪   খবরের বাইরে বিভাগ


আশি বছর পূর্ণ হল আজ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের। শুভ জন্মদিন স্যার। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তাঁর মেধা অনুযায়ী অনেক বেশী লেখেননি। এই অভিযোগ অনেকের। যে কারণে তাঁর ছাত্রদের অনেকে যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়ে গেছেন, তার অনেক পরে তিনি এই পুরস্কারটি অর্জন করেন। ২০১২ সালে এই পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে সায়ীদ স্যারকে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছিলাম আমি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সেমিনার রুমে তখন কে যেন বলেছিল, বাংলা একাডেমি পুরস্কার আজ ধন্য হল সায়ীদ স্যারকে পুরস্কৃত করতে পেরে। আসলে পুরস্কার, স্বীকৃতি, খ্যাতি, যশ, অর্থ প্রতিপত্তির ওপর নির্মোহ বলেই সবার এত প্রিয় মানুষ তিনি। এই কিংবদন্তি মানুষটির আজ ২৫ জুলাই আশিতম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন স্যার, প্রার্থনা করি আপনি শতায়ু লাভ করুন।

সায়ীদ স্যার বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে ভালোবাসেন। কারণ তিনি মনে করেন, আমি যদি পৃথিবীতেই না থাকি, তাহলে কে আমাকে মনে করল কিংবা করল না তাতে কি আসে যায়! আসলেই তো কি আসে যায় ? তবু আমরা নিজের দর্পণে নিজেকে না দেখে কেবল ছুটতে থাকি। এক সময় টুপ করে ঝরে পড়ি। নিজের আয়নায় নিজেকে দেখা হয় না। নিউইয়র্কে মুক্তধারা আয়োজিত বাংলা বইমেলায় মীর্জা গালিবের কবিতার পংক্তি আউড়ে সায়ীদ স্যার বলেছিলেন, আমরা কিছু হলে অন্য দেশের সমালোচনা করি। অমুক কি করল সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই। কিন্তু নিজের দিতে তাকাই না। গালিব যেমন সুন্দর মুখ ভালোবাসে। সুন্দর মুখ ভালোবাসে গালিব। কিন্তু গালিব কি নিজের চেহারা আয়নায় দেখে ? সমাজের-রাষ্ট্রের কঠিন সত্যিগুলি এভাবে সায়ীদ স্যার বলে ফেলেন অবলীলায়। যে কারণে অনেকের কাছে তিনি অপ্রিয় মানুষ। কারো কারো চক্ষুশূল। কারণ তিনি কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করেন না। কারো মন রাখার কিছু বলেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রিয় তিনি। সায়ীদ স্যার গায়ক নন, নায়ক নন, তবু তাঁর কথা শোনার জন্য ঘন্টার ঘন্টা মানুষ অপেক্ষা করে থাকে। আর যখন তিনি বলতে শুরু করেন, পিনপতন নীরবতা নেমে আসে চারদিকে। হয়ত অতি সাধারণ ঘটনা, কিন্তু ওনার বলার গুনে অসাধারণ হয়ে ওঠে।

এক ছাত্রের কথা বলেছিলেন সায়ীদ স্যার গত বছর বইমেলার সময়। অনেকদিন আগের ঘটনা। স্যার গাড়ী চালিয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আসছিলেন। স্যারের গাড়ির একটা লাইট নষ্ট ছিল বলে খুব চেষ্টা করছিলেন ট্রাফিক পুলিশ এড়ানোর জন্য। হঠাৎ ফার্মগেটের কাছে একটা সিগনালে পড়ে গেলেন। একটু পরে অনুভব করলেন, বিশাল দেহী ট্রাফিক সার্জেন্ট বিশাল শরীর নিয়ে থপ থপ করে তাঁর দিকে আসছেন। স্যার না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ কাছে এসে জানালার কাঁচ ওঠাতে বলল। স্যার যখন অনিবার্য বিপর্যয়ের আশা করছিলেন, তখন সেই হাতি সদৃশ ট্রাফিক সার্জেন্টের কণ্ঠ থেকে ইদুঁরের মতো চি চি শব্দ শোনা গেল, ‘স্লামালাইকুম স্যার’।

সায়ীদ স্যার বিশ্বাস করেন, মফস্বল থেকে উঠে আসা একজন ছাত্র প্রথম যখন কলেজে ভর্তি হয়, তখন তার নতুন জীবন শুরু হয়। তার শিক্ষকরা হয়ে ওঠেন তাঁর নায়ক। জীবনের নানা উত্থানে-পতনেও ছাত্রের সেই ভক্তিতে মরিচা পড়ে না। নিজের জীবন দিয়ে আমি সেই সত্যের প্রমাণ পেয়েছি। নতুবা আমার কোন প্রয়োজন ছিল পুরান ঢাকা থেকে বহু পথ পাড়ি দিয়ে সেই বাংলা মটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে যাবার। কিন্তু সেই কৈশোরউত্তীর্ণ চেতনার উন্মেষকালে ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছিলেন সায়ীদ স্যার। খুঁজতে বলেছিলেন নিগুঢ় সত্যিকে। মানুষের ভিতরের আসল মানুষটাকে। মানব চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে ভালোবাসতেন তিনি। সুদূরের ভাবনা প্রোথিত করতেন ছাত্রদের মধ্যে। ডাকঘরের ফটিকের মতো জানতে ইচ্ছে করতো, ‘পাহাড়ের ওপাশে কি আছে ? ‘ সায়ীদ স্যার মনে করতেন, প্রেম হল পাহাড় চূড়া যেখানে মাত্র একজন দাঁড়াতে পারে। আর বন্ধূত্ব মালভূমির মতো। নিউইয়র্কে আসার কিছুদিন আগে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বন্ধু নাহিদ আহসানের সঙ্গে স্যারের ভুতের গলির বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে স্যারকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সত্যিকারের ভালোবাসা বলে আসলেই কি কিছু আছে ? সব ভালোবাসারই তো এক সময় সমাপ্তি ঘটে। স্যার আমার সঙ্গে একমত হননি। তিনি বলেছিলেন, অনেককেই দেখা যায় আমৃত্যু একজনকেই ভালোবাসতে। যেমন লেখক হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এন্ডারসনের মৃত্যুর পরে তাঁর পকেটে মৃত প্রেমিকার চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। যেটা তিনি সব সময় সাথে নিয়ে ঘুরতেন।

এভাবে যখন যেটা মনে হত, সায়ীদ স্যারের কাছে জানতে চাইতাম। সব উত্তর যেন তাঁর কাছে ছিল। আমি একটা বানীতে সব সময় বিশ্বাস করতাম,- ‘যে বিষয়ে তুমি কি করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছ না, সেই ক্ষেত্রে তুমি যাদের শ্রদ্ধা কর ও ভালোবাস তাদের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ কর।’ সেই কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকে যে কারণে সায়ীদ স্যারকে অনুসরণ করি। কারণ তিনি একজন সত্যিকারের নেতা। অনেক দূরের স্বপ্ন দেখেন বলে আলোকিত মানুষ তৈরীর জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সৃষ্টি করেছেন। ষাটের দশকে তাঁর সম্পাদিত কণ্ঠস্বর পত্রিকা ছিল প্রায় সব কবিদের আশ্রয়স্থল। অথচ স্যার নিজে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চাননি। তিনি সবাইকে এগিয়ে দিয়ে প্রকৃত নেতার মতো পিছনে থেকেছেন। অনেকটা তাঁর প্রিয় চরিত্র হ্যামলেটের মত। অসামান্য গদ্য লেখার ক্ষমতা থাকার পরেও খুব বেশী বই লেখেননি। যদিও তাঁর লেখা দুই তিনটি বই আমার কাছে অনেকটা পবিত্র গ্রন্থের মতো। সায়ীদ স্যার যখন নিউইয়র্কে এসে আমাকে খোঁজেন কিংবা বাংলাদেশ থেকে লোক মারফত ফোন করার জন্য বলেন এবং ফোন করার পরে অনুরোধ করেন কিছু বই অনুবাদ করে দিতে, তখন নিজের অযোগ্যতায় খুব অসহায় লাগে। আপনাকে বড় মুখ করে বলার মতো কিছুই করতে পারেনি আজও। তবু স্যার আপনার মতো মানুষের জন্ম হয়েছিল বলেই পৃথিবীতে নিজের চলার পথকে এত মসৃন মনে হয়।

(নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মনিজা রহমানের লেখাটি তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)




 এ বিভাগের অন্যান্য


বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এরশাদ-জিনাত


দুই বছর ধরে ঢামেকে শিশুটি, স্বজনদের খোঁজ নেই


হঠাৎ স্ক্রিন শট শেয়ার করলেন সাংসদ, কিন্তু কেন?


ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন গোলাম মোর্তুজা


অবিশ্বাস্য পতন


মেকআপের যুগে অন্যরকম এক মানুষ


১৬ টাকা থেকে যেভাবে আজকের আকিজ গ্রুপ


ইতালিতে বাংলাদেশির সততার দৃষ্টান্ত


বিনা খরচে যেভাবে জাপান যাওয়া যাবে


ভারতীয় মন্ত্রীরা যেভাবে বদলে দিচ্ছেন বিজ্ঞানের ইতিহাস


সব সময় ইতিবাচক থাকার কয়েকটি উপায়


শাড়ি ও নারী নিয়ে লিখে সমালোচনার মুখে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ


মন্ত্রিত্ব-পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া কুঁড়েঘরের মোজাফফর


ভারতীয় হিসেবে গর্বিত নন অমর্ত্য সেন


একজন সুলতান সুলাইমান





All rights reserved www.durbinnews.com