www.durbinnews.com::জানি এবং জানাই

একজন সুলতান সুলাইমান



 দূরবীন ডেস্ক    ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার, ১:৫৯   খবরের বাইরে বিভাগ


সুলতান সুলাইমান। ইতিহাসের এক মহানায়ক। চোখ যতদূর যায় ততোদূর পর্যন্ত বিস্তার ঘটিয়েছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের। তার প্রভাব এতোটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, সৈন্যদের মনোবল যেন ভেঙে না পড়ে, সেজন্য গোপন রাখা হয়েছিল মৃত্যুসংবাদ।  সাম্রাজ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল তার শক্তি ও সক্ষমতার গল্প। ইউরোপ তাকে দিয়েছিল ম্যাগফিসেন্ট উপাধি। যদিও নিজ হেরমখানায় নীতির কারণে সমালোচিত ছিলেন তিনি। সুলতান সুলাইমানের পিতা সেলিম এশিয়া ও আফ্রিকায় একচ্ছত্র অধিপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অটোম্যানদের। পুত্র সুলাইমান অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান ইউরোপ পর্যন্ত।  Encyclopedia Britannica তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় এভাবে- সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য কেবল সামরিক অভিযান নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি। আইন, সাহিত্য, শিল্প এবং স্থাপত্যের যেগুলো পরবর্তীতে অটোম্যান বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকৃত হয়েছে, তার বিকাশ ঘটেছে মূলত তার আমলে। ট্রাবজোনে সুলাইমানের জন্ম ১৪৯৪ সালের ৪ নভেম্বর।  মা আয়েশা হাফসা ছিলেন ক্রিমিয়ার ধর্মান্তরিত মুসলিম। হাতেখড়ি হয়েছিল দাদি গুলবাহার খাতুনের কাছে। তারপর, মাত্র সাত বছর বয়সেই ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদের রাজকীয় পাঠশালায়। খায়রুদ্দীন খিজির এফেন্দির তত্ত্বাবধানে ঘুরে আসেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, যুদ্ধবিদ্যা ও ধর্মতত্ত্বের চৌহদ্দি। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভের পাশাপাশি ছয়টি ভাষায় দক্ষতাও অর্জিত হয়- অটোম্যান তুর্কি, আরবি, সার্বিয়ান, চাগতাই তুর্কি, ফারসি এবং উর্দু। মাত্র পনেরো বছর বয়সে প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে আসীন হন সুলাইমান। পিতা এবং চাচাদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে গৃহবিবাদ শুরু হয় ইতোমধ্যে। পিতার পক্ষে বিশ্বস্ত সেনাপতির ন্যায় লড়াই করেন এশিয়া মাইনরে, প্রবল বিক্রমে। সিংহাসনে আরোহন করলেন সেলিম, পুত্রকে দিলেন ইস্তাম্বুলের ভার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের যোগ্যতায় সুলাইমান অর্জন করলেন আনাতোলিয়া ও মিশরের শাসনকর্তার পদ। সিংহাসনে বসার আগে থেকেই ঈর্ষনীয় রকমের জনপ্রিয় ছিলেন সুলাইমান। অবশিষ্ট দিন কেমন যাবে, তা নাকি সকাল দেখেই বোঝা যায়। সুলাইমানের ক্ষেত্রেও তা শতভাগ সত্যি। দীর্ঘ ৪৬ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসন শেষে যখন মৃত্যুবরণ করেন তিনি, ততদিনে তার জনপ্রিয়তা অটোম্যান-সীমানা ছাড়িয়ে, ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।

সুলেমান সিংহাসনে আরোহন করেন ১৫২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। মা থাকেন পরামর্শক হিসেবে। মৃত্যুর আগে সেলিম অটোম্যান সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল একটা ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে যান। ভূমধ্যসাগরীয় অর্থনীতি, এশিয়া ও আফ্রিকার রাজনীতি, এমনকি ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রাধান্য নিশ্চিত হয়। কিন্তু অনেক কাজ যেন তখনো বাকি। সুলাইমান পিতার সাথেই ছিলেন পুরো সময়। তাই হয়তো বুঝতে ভুল করেননি পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে। মনোযোগ দিলেন সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ইউরোপীয় অঞ্চলের দিকে। বলা হয়- খুব বিপজ্জনক গতিতে সুলাইমান তার রাজত্ব শুরু করেন। বেলগ্রেড, রোডস এবং হাঙ্গেরি- একে একে অনুগত করেন নিজের। প্রথম জীবনের বন্ধু ইবরাহীম পারগালিকে প্রধানমন্ত্রী করে সাথে রাখা হয়। যদিও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে শিকার হয়ে জীবন দিতে হয়েছিল তাকে। ওদিকে, সুলতান সুলাইমান দখলে নেন ইউরোপের বড় একটি অংশ। একের পর এক সমরে জয়লাভ করেন। স্বীয় সাম্রাজ্যে কানুনি বা আইনপ্রণেতা হিসেবে খ্যাত হন সুলেমান। প্রধান কারণ, আইন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার। তুর্কি-সাফাভি ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দেন তিনি। অটোম্যান সৈন্যদের খাদ্য ও সম্পত্তি ক্রয়ের আইন জারি হয়। এমনকি শত্রু অঞ্চলে অভিযানে গেলেও বলবৎ থাকবে সেই আইন। কর ব্যবস্থা সংশোধন ও অতিরিক্ত কর বাতিল করা হয়। রাষ্ট্রীয় নিয়োগে আত্মীয় বা পরিবারের চেয়ে মেধাকে মূল্যায়ন করার জন্য দেওয়া হয় তাগিদ। উঁচু ও নিচু- সমাজের সব তলার সকলের জন্যই, আইন ছিল সমান।  প্রশাসনব্যবস্থা ও সামরিক শক্তিকে ঢেলে সাজান সুলতান। সমগ্র সাম্রাজ্যকে ২১টি প্রদেশে এবং ২৫০টি সানজাক বা জেলায় বিভক্ত করেন। সানজাককে ভাগ করা হয় কাজাস-এ। কাজাসের শাসনকর্তা ছিলেন কাজ, সানজাকের পাশা এবং প্রদেশের গভর্নর। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যও তার পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার।  সুলতান সুলাইমানের সময়টি অটোম্যান ইতিহাসের স্বর্ণযুগ হিসাবে স্বীকৃত। সামরিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা দিয়েই শুধু না, বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্যের অনন্য উচ্চতায় আসীন হয় সাম্রাজ্য। নির্মাণের অনেক নিদর্শন আজ পর্যন্ত টিকে আছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে সুলতানের স্ত্রী ছিল দুই জন। প্রথমজন মাহিদেভরান। তার গর্ভে জন্ম নেন বুদ্ধিমান ও যোগ্যতম পুত্র মোস্তফা । দ্বিতীয়জন ইউক্রেনীয় দাসী থেকে স্ত্রী-তে পরিণত হওয়া হুররাম সুলতান, সুলাইমানের প্রিয়তম-পত্নী ও ছয় পুত্রের জননী।  রূপকথার ইন্দ্রজালের মতও তিনি বশ করে  ছিলেন দিগ্বিজয়ী সুলাইমানকে। হুররাম জানতেন, যদি হারেমের নিয়ম অনুযায়ী মোস্তফা ক্ষমতায় আসে, তাহলে তার সকল সন্তানকে হত্যা করা হবে। আগেও এমনটিই হয়ে এসেছে। তাই প্রচার করলেন, মোস্তফা তার পিতাকে সিংহাসনচ্যুত করতে চায়। এই প্রোপাগান্ডার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৫৫৩ সালে সুলতান তার যোগ্যতম পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ক্ষমতায় আসেন হুররামের বড় পুত্র সেলিম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মোস্তফার কোনো গুণই তার মধ্যে ছিল না। হেরেমের বাইরে সুলেমান যতটা যোগ্যতম হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, হেরেমের ভেতরে ছিলেন ততটাই দুর্বল। এজন্যই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে বলি হতে হয়েছে ইবরাহিমের মতো প্রধানমন্ত্রী এবং মোস্তফার মতো যোগ্য উত্তরাধিকারীকে। তার মৃত্যুর পর থেকেই অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে অটোম্যান সাম্রাজ্যে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, দুইজন রাজপুত্রের সিংহাসন লাভে ব্যর্থতার পরিণাম, অভিশাপ হিসাবে সাম্রাজ্যের উপর পড়েছে- মোঘল ইতিহাসে দারশিকোহ আর অটোম্যান ইতিহাসে মোস্তফা।




 এ বিভাগের অন্যান্য


বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এরশাদ-জিনাত


দুই বছর ধরে ঢামেকে শিশুটি, স্বজনদের খোঁজ নেই


হঠাৎ স্ক্রিন শট শেয়ার করলেন সাংসদ, কিন্তু কেন?


ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন গোলাম মোর্তুজা


অবিশ্বাস্য পতন


মেকআপের যুগে অন্যরকম এক মানুষ


১৬ টাকা থেকে যেভাবে আজকের আকিজ গ্রুপ


ইতালিতে বাংলাদেশির সততার দৃষ্টান্ত


বিনা খরচে যেভাবে জাপান যাওয়া যাবে


ভারতীয় মন্ত্রীরা যেভাবে বদলে দিচ্ছেন বিজ্ঞানের ইতিহাস


সব সময় ইতিবাচক থাকার কয়েকটি উপায়


শাড়ি ও নারী নিয়ে লিখে সমালোচনার মুখে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ


মন্ত্রিত্ব-পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া কুঁড়েঘরের মোজাফফর


ভারতীয় হিসেবে গর্বিত নন অমর্ত্য সেন


একজন সুলতান সুলাইমান





All rights reserved www.durbinnews.com