আন্তর্জাতিক


ইরান কি ভেঙে যাবে?


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার

ইরান কি ভেঙে যাবে?

ছবি: সংগৃহীত


সব আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে ইরানে দ্বিতীয়বারের মতো যুগপৎ হামলা চালিয়েছে মহাক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র ও এর প্রধান মিত্র ইসরায়েল। এবারের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর এখন অনেকের মনে প্রশ্ন প্রাচীন সভ্যতার এই দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা পাবে তো?

 

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইরানের নির্বাসিত ‘যুবরাজ’ রেজা পাহলভি নিজের ওয়েবসাইটে ইরানের অখণ্ডতা রক্ষায় দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ইরানের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো আপস হবে না। আমরা ইরানের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না।” তার ভাষ্য, ইরানের ভৌগোলিক বিভাজন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যাবে না। যারা দেশের অখণ্ডতা নষ্ট করতে কাজ করবে কিংবা সমর্থন দেবে, তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে।

 

এতে আরও বলা হয়, ইরানের অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত’ লড়াই চালিয়ে যাবে।

 

উল্লেখ করা যায়, আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ইরানের জনগণের প্রবল আন্দোলনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন সম্রাট রেজা শাহ পাহলভি। সে সময় যুবরাজ রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে ছিলেন। সাবেক এই রাজার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা এবং নিজ দেশের জনগণের ওপর কঠোর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।

 

ইরান-সম্রাট দেশত্যাগের পর যারা ক্ষমতায় আসেন, তাদের বিরুদ্ধেও জন-নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করায় বিপ্লব-পরবর্তী শাসকরা বিশ্বজুড়ে ‘প্রতিরোধের মুখ’ হিসেবে পরিচিতি পান।

 

সাম্প্রতিক হামলায় খামেনির নিহত হওয়ার খবরে ইরানে খামেনিপন্থিদের শোকের পাশাপাশি পাহলভিপন্থিদের উল্লাসের ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এমন বাস্তবতায় দুই পক্ষই ইরানের অখণ্ডতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবুও প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে।

 

কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিল এক প্রতিবেদনে বলেছিল “ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা একটি অলীক কল্পনা।” সেখানে ইরানের সম্ভাব্য ভাঙনকে ‘বলকানাইজেশন’ বা ‘বলকানীকরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যার উদাহরণ সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভাজন।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভগুলো মূলত রাজনৈতিক ছিল; জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিদ্রোহের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। অধিকাংশ ইরানি এক পতাকার নিচে থাকার মানসিকতা পোষণ করেন।

 

তবে জাতিগত বিভেদের চিত্রও উপেক্ষা করার মতো নয়। ইরানে প্রধান সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে আজেরি, কুর্দি, আরব ও বেলুচ। প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশে সংখ্যালঘুরা মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নেও ক্ষোভের কথা বলা হয়।

 

ইরানে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ শিয়া মতাবলম্বী হলেও সুন্নি সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। কিছু অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

 

তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইরানকে ‘বলকানের’ মতো ভেঙে ফেলার ধারণাকে ‘কৌশলগত ভ্রান্তি’ বলা হয়েছে। সেখানে যুক্তি দেওয়া হয় বলকান অঞ্চলে বাইরের শক্তির সরাসরি আগ্রাসন ছিল না; জাতিগত আত্মপরিচয়ের উত্থান থেকেই বিভাজন ঘটে। কিন্তু ইরানের জাতিগত বৈচিত্র্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গভীরভাবে সংযুক্ত।

 

তবে ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন যুগোস্লাভিয়ার নেতা মার্শাল টিটোর মৃত্যুর আগ পর্যন্তও ঐক্যের বয়ান জোরালো ছিল। তার এক দশক পরই শুরু হয় বিভাজন। ফলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।

 

প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, ইরান অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব ককেশাস, উপসাগরীয় অঞ্চল, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ইরানকে ভেঙে ফেলার আগে বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে বহুমাত্রিক হিসাব-নিকাশ করতে হবে।

 

ইরানের পশ্চিমে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বে সিস্তান-বেলুচিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা প্রায়ই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে। বেলুচ ও কুর্দিদের মধ্যে স্বাধীনতার দাবিও রয়েছে। উত্তর-পশ্চিমে আজেরিদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা বিদ্যমান। তবে এসব আন্দোলন সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কাঠামো অটুট রয়েছে।

 

রেজা পাহলভি সম্প্রতি এক মতামতে বলেছেন, “ইরান ইরাক নয়।” ইরাকে বিদেশি হস্তক্ষেপের পর যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আশঙ্কা ও বিশ্লেষণ চলছে।

 

তথ্য সূত্র: ডেইলি স্টার


সম্পর্কিত

আন্তর্জাতিক খবরইরানরাজনীতি

জনপ্রিয়


আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন

ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে হামলার দাবি ইসরায়েলের

তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক টেলিগ্রাম বার্তায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) এ দাবি জানায়।

পাকিস্তানে সব ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র

পাকিস্তানে চলমান অস্থির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে সব ধরনের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাময়িকভাবে বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসলামাবাদে অবস্থিত দূতাবাসের পাশাপাশি লাহোর ও করাচি কনস্যুলেটের নির্ধারিত সব ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত করা হয়েছে। খবর আলজাজিরার। বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত আগামী শুক্রবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান: কোন অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, কত খরচ পড়ছে?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে গত শনিবারের হামলার পর। ওই দিন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে বিমান হামলা চালায়। এতে দুই দেশের প্রকাশ্য সামরিক শত্রুতা নতুন করে উসকে ওঠে। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘চিরকাল’ যুদ্ধ চালানোর মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র মজুত আছে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ‘মাঝারি ও উচ্চ-মাঝারি’ মানের যুদ্ধাস্ত্রের বিশাল মজুদ দিয়ে ‘চিরকাল’ পর্যন্ত যুদ্ধ চালানো সম্ভব বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার স্থানীয় সময় মধ্যরাতের ঠিক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social–এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে এ মন্তব্য করেন।