দিনে দিনে যেন অপরাধীদের নিরাপদ আবাস্থল হয়ে উঠছে দুবাই। জাঁকজমকপূর্ণ এই শহরে আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে অপরাধীদের আনাগোনা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় পড়া রুশ ধনকুবেরদের অনেকে দুবাইয়ে পালিয়ে এসেছেন, কেবলমাত্র নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য।
এছাড়াও অবৈধ টাকার পাহাড় নিয়ে মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে এসে এখানে দিব্যি বিলাসী জীবন-যাপন করছেন অনেক অপরাধীই।
এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশি অপরাধীরাও। অনেক শীর্ষ দুর্বৃত্ত ,দেশে অপরাধ কর্ম করে টাকা নিয়ে এখন স্থায়ী হয়েছেন মরুর এই দেশটিতে। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, দুবাইয়ে অবস্থান করেও সেখানে বসেই তাঁরা দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আরাভ জুয়েলার্সের মালিক আরাভ খান অপরাধের দায়ে দুবাই পালিয়ে যাওয়ার পর, দেশে অপরাধ করে বিদেশে অবস্থানের ব্যাপারটি আবারো আলোচনায় এসেছে।
শুধুমাত্র আরাভ খান নয়, আরাভের মতো শীর্ষ অনেক দুর্বৃত্তই দেশে অপরাধ করে দুবাইয়ে পাড়ি জমিয়েছেন।
বছর খানেক আগে ঢাকার মতিঝিলের অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ দ্বন্দ্বে প্রাণ হারান, আওয়ামীলীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু। এ ঘটনায় শীর্ষ অপরাধী জিসান ও জাফরের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ।
তবে জিসান এখন স্থায়ী আবাস গড়েছেন দুবাইতে। আর জাফর আমেরিকা থাকলেও অবকাশ যাপনে নিয়মিতই দুবাই আসা যাওয়া করেন। জানা গেছে, এমন অন্তত এক ডজন শীর্ষ দুর্বৃত্ত দুবাই শহরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন।
অপরাধীদের কাছে আশ্রয়স্থল হিসেবে দুবাই পছন্দ করার অনেক কারণ আছে। বসবাসের পাশাপাশি অবকাশযাপনে দুবাই শহর অন্যান্য শহরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।
তাছাড়া, বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্দী প্রত্যার্পণ চুক্তি না থাকায় সেখান থেকে অপরাধীদের ফিরিয়ে আনাও কঠিন।
আর ঠিক এই সুযোগটাইনেন অপরাধীরা। তাঁরা প্রথমেই তাঁদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ভারতীয় পাসপোর্ট বানিয়ে নেন। তারপর ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দুবাই প্রবেশ করেন।
দুবাইতে কোনো ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে দুবাই গেলে সে দেশের কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে গণ্য করে না। অপরাধী বাংলাদেশি নাগরিক হলেও বন্দি চুক্তি না থাকায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
২০১৯ সালে শীর্ষ অপরাধী জিসানকে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, তাঁর পাসপোর্ট অন্যদেশী হওয়ায় তাঁকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় নি।
যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড এলার্ট জারি ছিল, তবুও অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার ফলে আদালত তাঁকে জামিন দিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে জিসান দুবাইতে বেশ বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।
খবর আছে, জিসান ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ দুর্বৃত্ত এই কৌশল বেছে নিয়ে সবার নাকের ডগায় থেকেও অপরাধ করে দুবাইতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জিসানের মতো একই কৌশল বেছে নিয়েছেন আরাভ খানও। কারণ, আরাভকে বাংলাদেশি প্রমাণ করতে হলে তাঁর আত্নীয়-স্বজনের DNA সংগ্রহ করে আদালতের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
যেটা খুবই লম্বা একটা প্রক্রিয়া। সে লম্বা সময়ের মাঝেই আরাভ খান জিসানের মতোই বার বার জামিনে বের হয়ে যাবেন বলে মনে করছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।
বন্দী প্রত্যার্পণ চুক্তি না থাকায় অপরাধীদের কোন্ প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরানো হবে, সে বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে শিগরিরই ঠিক করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অথবা প্রত্যাবর্তন চুক্তিটি সম্পন্ন করা গেলেই দেশের শীর্ষ অপরাধীদের এই দুবাই যাত্রার রথ থামানো যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।