আজকের খবর


যে কোন দুর্ঘটনায় সবার আগে হাজির হয় ফায়ার সার্ভিস


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:০৮ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার

যে কোন দুর্ঘটনায় সবার আগে হাজির হয় ফায়ার সার্ভিস
যে কোন দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা, সবার আগে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় যে বাহিনী তার নাম ফায়ার সার্ভিস। বাস্তব জীবনের নায়ক হয়ে, ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করে আনে শিশু, বৃদ্ধ সহ নানা বয়সী মানুষদের।

আগুনের লেলীহান শিখা দেখে যখন সাধারণ মানুষের হৃৎপিন্ড কেপে উঠে, তখন কাধে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার চাপিয়ে, বিশেষ এই বাহিনীর প্রশিক্ষিত সদস্যরা ঝাপিয়ে পড়ে জ্বলন্ত আগুনের উপর।

দিন কিংবা রাত, যে কোন সময়ে যে কোন ঋতুতে, রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে দূরন্ত ছুটে চলা তাদের। লক্ষ্য একটাই, মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, অগ্নি যোদ্ধাদের নানারকম ছবি ভাইরাল হয়। কোনটিতে দেখা যায় নিজ সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন ছোট্ট শিশুকে।

কোনটিতে আবার আপন বাবা, মা, ভাইবোনের মতো কাধে তুলে নিয়েছেন আটকে পড়াদের।  কাজ শেষে লুটিয়ে পড়া দেহই বলে দেয়, কতটা ডেডিকেশন দিয়ে লড়াই করেন এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্য।

কিন্তু কথায় আছে, সব নায়কের গলায় জয়ের মালা জুটে না। ফায়ার সার্ভিসের বেলাতেও তাই। উলটো হজম করতে হয় পাবলিকের গালি, হতে হয় বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার শিকার।

বঙ্গবাজারের অগ্নি দুর্ঘটনার সময়েও দেখা গেছে এমন দৃশ্য। আগুন নিয়ন্ত্রনে ফায়ার ফাইটাররা যখন জীবন দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন, সেই মুহুর্তে একদল অতি উৎসাহী জনতা হামলা করে বসে সংস্থাটির সদর দপ্তরে।

ভেঙে ফেলে কোটি টাকা দামের গাড়ি ও বিল্ডিংয়ের বারান্দায় থাকা কাচের দেয়াল। সবচেয়ে দু:খ জনক বিষয় হলো, আপনার আমার মতো মানুষেরাই এসব বীরদের গায়ে হাত তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। 

শুধু আগুন নয়, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস ও বন্যার মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়কে গাড়ি এক্সিডেন্ট, পানিতে নৌ দুর্ঘটনা, রাস্তায় ভেঙে পড়া গাছ সরানো থেকে শুরু করে, সব জায়গাতেই দেখা মিলে তাদের। 

এমনকি গাছের উচু ডাল, কিংবা বহুতল ভবনের কার্নিশ থেকে প্রানীকেও উদ্ধার করে চলে পরম মমতায়। বহুবার আমাদের সামনে এসেছে এসব চিত্র।

বিনিময়ে পায় মাস শেষে অল্প কিছু বেতন। এর বেশি অবশ্য কিছু প্রত্যাশাও থাকে না তাদের। কারন মানুষের সেবা করাটাই ফায়ার সার্ভিসের ধর্ম।

পর্দার আড়ালের নায়ক হয়ে, অনেকটা নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। নিজেদের বীরত্বের খবর, মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করে না। নেই ক্রেডিট নেয়ার ধান্দা। 

আমাদের কাছে ফায়ার সার্ভিস নামে পরিচিত এই বাহিনীর পুরো নাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

তৎকালীন বৃটিশ সরকার অবিভক্ত ভারতে ১৯৩৯ সালে ফায়ার সার্ভিস সৃষ্টি করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর, যা হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান ফায়ার সার্ভিস।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮১ সালে আসে আরো একটি বড় পরিবর্তন। সেই সময় সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে, ফায়ার সার্ভিস পরিদপ্তর ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে একীভূত করে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মতো আধুনিক সরঞ্জাম নেই, নেই বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ। আগুন লাগলে মোড়ে মোড়ে পাওয়া যায় না ফায়ার হাইড্রেন্ড। আছে আরো নানারকম সীমাবদ্ধতা।

তবুও শুধুমাত্র একটি ফোন কল, অথবা যে কোনভাবে বার্তা পৌছাতে পারলে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাইরেন বাজাতে বাজাতে ঘটনা স্থলে হাজির হয়ে যায়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাল রঙের গাড়ি।

২০২২ সালে সাড়ে ১৪ হাজারের অধিক অগ্নি দুর্ঘটায় অপারেশন চালিয়েছে তারা। আগুন নিয়ন্ত্রনে আনার পাশাপাশি, উদ্ধার করেছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ।

একই বছরে পুকুর, ডোবা, খাল ও নদীপথের দুর্ঘটনা থেকে, আহত ও নিহত মিলিয়ে উদ্ধার করেছে, হাজারের অধিক মানুষকে। এছাড়া ৫১৪টি দুর্ঘটনায় উদ্ধার করা হয়েছে ৫৩০টি প্রানী।

২০২২ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, অগ্নিকান্ড ব্যাতীত অন্যান্য দুর্ঘটনাস্থল থেকে জীবিত উদ্ধার করেছে ১৩ হাজার ১৬৮ জনকে। একই সময়ে নিহত উদ্ধারের সংখ্যা ছিল আড়াই হাজারের অধিক।

এসব অপারেশন চালাতে গিয়ে গত এক বছরে শহীদ হয়েছেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ জন সদস্য। আহত হয়েছেন ২৯ জন।

বঙ্গবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে, এবং জনগনের হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন আরো ১০ জন। যার মধ্যে দুজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ক্রিটিক্যাল অবস্থায়।

শুধু দুর্ঘটনা স্থলে উদ্ধার অভিযান নয়, মানুষকে সচেতন করতে নানা রকম পদক্ষেপ নেয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভেল ডিফেন্স। হাতে কলমে দিয়ে থাকে আগুন নিয়ন্ত্রনের প্রাথমিক প্রশিক্ষন।

ঝুঁকিপর্ন স্থাপনা চিহ্নিত করে নোটিশ দেয়া তাদের নিয়মিত কাজের অংশ। কিন্তু এসবে খুব একটা তোক্কা করে না মালিকেরা। এতকিছুর পরেও দিন শেষে সব দোষ হয় ফায়ার সার্ভিসের। 
 






জনপ্রিয়