আজকের খবর


বেরিয়ে এল বিদ্যানন্দের থলের বিড়াল!


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:১৬ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার

বেরিয়ে এল বিদ্যানন্দের থলের বিড়াল!
বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বিদ্যানন্দের থলের বিড়াল! মানবসেবার আড়ালে প্রতিষ্ঠানটি যে ধরণের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শুরুতে শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেও, এখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে প্রাধান্য পেয়েছে ‘খাদ্য ও অন্যান্য কর্মসূচি’।

‘আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন’ এই স্লোগানে কাজ শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ৩৮০ ডিগ্রী ঘুরে গিয়ে কিভাবে অন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে? সেখানে কি তাদের স্বার্থ? অডিট রিপোর্টগুলোতে অসঙ্গতি থাকার পরও এ নিয়ে কেন কোন কথা বলে না বিদ্যানন্দ?

বাকি প্রতিবেদনে দেখুন বিস্তারিত— 

গত ১৫ এপ্রিল, বিদ্যানন্দকে তাদের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজ থেকে ‘পোড়া কাপড়ের তৈরী সজ্জার অলংকার’ শিরোনামে একটি ছবি পোস্ট করতে দেখা যায়। যেখানে ছিল গলার মালা, চুরি এবং কিছু তৈজসপত্র। 

বিদ্যানন্দের পোস্ট অনুসারে, ‘কয়েক ঘণ্টা আগেই এসব দামি কাপড় ছিলো, আগুন ধরে শেষে ছাইয়ে ছাপা পোড়া কাপড়ে পরিণত হয়েছে’।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ‘এই পোড়া কাপড়ের অংশ উদ্ধার করে তৈরী করা হচ্ছে সুন্দর সব অলংকার’। কিন্তু রিউমার স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যানন্দের এ দাবিটি পুরোপুরি মিথ্যে। 


রিউমার স্ক্যানার এর মতে, তাদের প্রকাশিত ৬টি ছবির মধ্যে ৪টিই গত ৯ মার্চ, ‘Women and e-Commerce Trust’ বা WE নামের একটি ফেইসবুক গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছিল। বিদ্যানন্দ মূলত পুরনো ছবিগুলোই ‘কয়েক ঘন্টা আগে পুড়ে যাওয়া কাপড় থেকে তৈরী অলংকার’ দাবিতে প্রচার করেছে।

এটি এমন সময়ে প্রচার করা হয়েছে, যখন চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়েছে নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের দোকান। এ সকল ব্যবসায়ীদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস যখন ভারি হয়ে উঠেছে, তখন বিদ্যানন্দ স্পর্শ করেছে মানুষের আবেগ।


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বিদ্যানন্দের এমন দাবির ব্যাখা জানতে চেয়ে জানিয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ডকে সাধারণ অসাধারণ মানুষ প্রায় সবাই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। তাদের উচিত এই পোস্টের ব্যাখ্যা দেওয়া।

কিন্তু এখন পর্যন্ত বিদ্যানন্দের তরফ থেকে কোনো ধরণের উত্তর পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, ‘পোড়া কাপড়ের তৈরী সজ্জার অলংকার’ শিরোনামের ওই পোস্টটিও তাদের পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে পারভীন শিরীন নামের এক উদ্যোক্তা নিজের ফেইসবুকে জানিয়েছেন, তিনি বুদ্ধি খাঁটিয়ে একটি পণ্য তৈরী করলেন আর পরিশ্রম করে পণ্যটির ছবি তুললেন; বিদ্যানন্দকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, সেই পণ্যের ছবি অনুমতি না নিয়েই কপি করে ফেললেন।

একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান হয়েও বিদ্যানন্দ কিভাবে এই কাজটি করতে পারলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

শুধু ‘পোড়া কাপড়ের তৈরী সজ্জার অলংকার’ এর বিষয়টিই নয়; নিজেরা সমুদ্র সৈকতে পানির বোতল ফেলে তা পরিস্কার করার নজিরও রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির। 

বিদ্যানন্দের এক টাকার আহার প্রজেক্টে একবার ষাড় গরুর ছবি দিয়ে অতিথিদের খাওয়ানোর কথা জানানো হয়েছিল। যেখানে খালেদ সাইফুল্লাহ নামের একজন জানতে চেয়ে কমেন্ট করেছিলেন, কোথায় খাওয়ানো হচ্ছে? আর কত তারিখে খাওয়ানো হবে?

কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো কমেন্ট ডিলিট করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নকর্তাকেই ব্লক দেয় বিদ্যানন্দ কর্তৃপক্ষ।

তবে ভিন্ন আরেকজনের কমেন্টে বিদ্যানন্দ জানিয়েছে, স্বজনপ্রীতি ও ঝামেলা এড়াতে তারা বিতরণের স্থান উল্লেখ করে না। যেটাকে হাস্যকর বলেই মনে করেছেন নেটিজেনরা।

এছাড়াও, ফেস দ্য পিপল’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, একই শিশুর ছবি একাধিক জায়গায় ব্যবহার করে দুই রকম প্রচারণা চালিয়েছে বিদ্যানন্দ। ওই শিশুর ছবি একবার দেখানো হয়েছে এতিমখানায় আহার করানো হিসেবে, আবার আরেক পোস্টে শহরের বাইরে বস্তিতে ইফতার করানো হিসেবে দেখানো হয়েছে।

মূলত ২০১৩ সালে ছোট পরিসরে বিদ্যানন্দের কার্যক্রম শুরু করেন চট্টগ্রামের ছেলে কিশোর কুমার। শুরুটা হয় পথ শিশুদের শিক্ষাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে। আর প্রথমদিকে বিদ্যানন্দের সমস্ত আর্থিক জোগান দিতেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে বসবাসকারী এই কিশোর।

বর্তমানে বিদ্যানন্দের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন পথশিশু শিক্ষা ও খাবার পায়। তাছাড়া, শিক্ষার্থীদের পোশাক, শিক্ষা উপকরণ, মাসিক বৃত্তি ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানাবিধ কাজ করে তাঁরা।

পরিচালনা করছে এক টাকায় আহার, এক টাকায় চিকিৎসা, এক টাকায় আইন সেবা কার্যক্রম। রামু ও রাজবাড়ীতে নিজস্ব জমিতে রয়েছে এতিমখানা। বিভিন্ন শাখায় সকলের জন্য বিনামূল্যে গ্রন্থাগার সুবিধা, ৭১ টাকায় নারীদের থাকার ব্যবস্থা, নির্বাচনী পোস্টার সংগ্রহ করে তা দিয়ে খাতা তৈরির মতো অসংখ্য কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু এসবের মাঝেও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না প্রতিষ্ঠানটির। তাদের অর্থের উৎস এবং অডিট রিপোর্টগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন অসঙ্গতি।

লেখক ও গবেষক পিনাকী ভট্টাচার্য এক প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশনে বিদ্যানন্দের ২০১৯ সালের অডিটের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, সেই বছর তাদের আয় সাড়ে ৬ কোটি টাকার মতো, কিন্তু ২০১৮ সালে বিকাশের মাধ্যমে ডোনেশন ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা। বাকি মূল ডোনারদের বরাবরই গোপন রেখেছে বিদ্যানন্দ।

বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘তারা ইভেন্টভিত্তিক কিংবা প্রতিষ্ঠানে অনুদান সংগ্রহ করেন না, কিংবা অর্থের জন্য কারো কাছে প্রস্তাবনা পাঠান না।’

কিন্তু অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন, বিদ্যানন্দ অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে QR code দিয়ে টাকা দান করার আহ্বান জানিয়ে পোস্টারিং করেছে। যা মূলত কিশোর কুমারের বক্তব্যের অসঙ্গতিকেই নির্দেশ করে।

আর এসব নানান অসঙ্গতির জেরেই প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত কার্যক্রম নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে আম-জনতা। যা নিয়ে একেবারেই সাইলেন্ট ‍মুডে বিদ্যানন্দ।  



জনপ্রিয়