এভিয়েশন


ফ্লাইট ভাড়া আকাশ ছোঁয়া, কমাতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:১৬ এপ্রিল ২০২২, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার

ফ্লাইট ভাড়া আকাশ ছোঁয়া, কমাতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ

নূর আলম সায়মন: 


তুচ্ছ অজুহাতে ঢাকা-মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ পথের সব রুটে ভাড়া বাড়িয়েছে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। রুট বিশেষে কোথাও দ্বিগুণ-কোথাও তারও বেশি। কী শ্রমিক কী ব্যবসায়ী সবাইকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। করোনার পূর্বে ঢাকা-রিয়াদ রুটে বিমানের ভাড়া ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া নেয়া হচ্ছে থেকে ১ লাখ টাকা। ঢাকা দুবাইয়ের রিটার্ন ভাড়া ছিল ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এখন সেটা নেয়া হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। 


এভাবে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে তুঘলকি কায়দায়। সিট নেই, যাত্রীর চাপ বেশি এসব কারণ দেখিয়ে লাখ লাখ গরিব শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে এখনো। এতে একদিকে যেমন অভিবাসী ব্যয় বেড়েছে, তেমনি অস্থিরতা ও নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে দেশের এভিয়েশন সেক্টরে। 


বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, ভাড়ায় হস্তক্ষেপ করা বা লাগাম টানার দায়িত্ব সরকারের নয়। এটি এই খাতের ব্যবসায়ীরাই ঠিক করবেন। 


সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানও জানিয়েছেন, তাদের করার কিছুই নেই। এ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি বাংলাদেশ (আটাব), বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা), হজ এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) এবং সাধারণ যাত্রীরা আলাদাভাবে এই ভাড়া নৈরাজ্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে। আটাব এবং বায়রা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও দিয়েছে। গলাকাটা ভাড়ার কথা অস্বীকার করছে এয়ারলাইন্সগুলোর কর্তৃপক্ষ। 


তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে ভাড়ার বিষয়টি ফয়সালা করা উচিত।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিনগুণ ভাড়া বেশি নিচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। কলকাতা থেকে দুবাই যেতে একজন যাত্রীকে ওয়ানওয়ে বিমান ভাড়া দিতে হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। সেখানে ঢাকা থেকে বিমান ভাড়া বাবদ বাংলাদেশিদের গুনতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিমানের ভাড়া নিয়ে নানা সমালোচনার পর অবশেষে প্রবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভাড়া ৫ হাজার টাকা কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মীদের চাপ থাকলে চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা এবং টিকিট সিন্ডিকেটে জড়িত ট্রাভেল এজেন্সি শনাক্ত করতে বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলেও জানানো হয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশকিছু দেশে যাতায়াতকারী ফ্লাইট ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে এক সভা হয়। এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ট্রাভেল এজেন্সি, বায়রা, বিমান বাংলাদেশের কর্মকর্তারা অংশ নেন। ওই সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


সভার সূত্রে জানা যায়, মোট ৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-প্রবাসী কর্মীরা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে ৫ হাজার টাকা কম মূল্যে টিকিট কিনতে পারবেন। এক্ষেত্রে কর্মীদের টিকিট কাটার সময় বিএমইটির স্মার্ট কার্ড প্রদর্শন করতে হবে।


এছাড়া ঢাকা বিমানবন্দরে রানওয়ে উন্নয়নের জন্য রাতে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় স্পেশাল সুবিধা দিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট চালানো হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সমন্বয় করে চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি যাতে অনেক টিকিট অগ্রিম বুকিং দিয়ে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে, এ ব্যাপারে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানান, বিমান ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসী কর্মীদের দুর্ভোগ লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের বিমান ভাড়া ৫ হাজার টাকা ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি ঈদের আগেই কার্যকর হবে।


প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বলেন, সম্প্রতি ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে গমনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের টিকিটের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের অভিবাসন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি টিকিটের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কর্মীদের বিদেশে যেতে বিলম্বিত হওয়ায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে।


অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ মাহাবুব বলেন, ফ্লাইটের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী কর্মী যাওয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন পর ওমরাহ ভিসা চালু হওয়ায় সৌদি আরবসহ অন্য দেশে বিমানে যাত্রীদের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। পক্ষান্তরে রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়নের কাজ চলায় এ সময় বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এতেও টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি বেশি পরিমাণে বিমান টিকিট অগ্রিম বুকিং করে পরবর্তী সময়ে উচ্চমূল্যে বিক্রয় করায় যাত্রীদের অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট ক্রয় করতে হচ্ছে। 


বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল বলেন, করোনার কারণে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী যাত্রীবাহী বিমানে নির্দিষ্টসংখ্যক আসন খালি রাখতে হয়। তাছাড়া জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ফিরতি ফ্লাইটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যাত্রী না পাওয়ায় টিকিটের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি করতে হয়েছে।


বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন সদস্য জানান, বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণের আইনগত এখতিয়ার বেবিচকের নেই। টিকিটের মূল্য একটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাছাড়া দেরিতে টিকিট সংগ্রহ করায় উচ্চমূল্যে টিকিট ক্রয় করতে হচ্ছে।


জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের অগ্রিম তালিকা প্রদান করলে চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে টিকিটের মূল্য কমে আসবে। এছাড়া বিএমইটির স্মার্ট কার্ডের বিপরীতে বাংলাদেশ বিমান টিকিটের মূল্যছাড় দেওয়া উচিত।’



জনপ্রিয়