বিশ্ব পরাশক্তিধর দেশগুলোর চোখ এখন বঙ্গোপসাগরে!
প্রভাব বিস্তার করতে মরিয়া চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত! প্রশ্ন হচ্ছে কেনো?
কিছুদিন আগেও বঙ্গোপসাগরের ওপর বিশেষ কোনো নজর ছিল না বিশ্বের। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতের নজর এই উপসাগরের দিকে।
মূলত ভূ-রাজনৈতিক কারণেই এই উপসাগর বিশ্ব পরাশক্তিদের কাছে এতোটা গুরুত্ব পাচ্ছে। এশিয়ার বৃহৎ পরাশক্তি চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ রুট হচ্ছে এই বঙ্গোপসাগর।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষেই মিয়ানমানের জলসীমায় নানা রকম স্থাপনা গড়ে তুলেছে চীন। এখান থেকেই চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে চীনকে চাপে রাখতে এই বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পকে রুখে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান বিশ্বে চীনের শক্তিশালী উত্থান ভালোভাবে গ্রহণ করেনি তারা। তাই চীনের উপর নজরদারি বাড়াতে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নেও বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব রয়েছে। অনেক দিন ধরেই দেশটি বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে।
এশিয়ার আরেক দেশ জাপানেরও এই উপসাগর ঘিরে স্বার্থ রয়েছে। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়তে থাকলে সেটা জাপানের জন্যও হুমকি।
তাই বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বিগ-বি প্রকল্প ঘোষণা করেছে দেশটি। বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে জাপানের বিনিয়োগ আদোতে এই প্রকল্পরেই একটি অংশ।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাব সহ্য করতে রাজি নয়। চীনের উপর নজরদারি বাড়াতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বাড়াচ্ছে দেশটি। রাডার স্থাপনের মাধ্যমে চীনের উপর নজরদারি করতে চায় তারা।
মার্কিন নৌ কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহানের মতে সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক, সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই মতবাদ অনুসরণ করেই চলেছে বিশ্ব পরাশক্তি দেশগুলো। তাইতো, বঙ্গোপসাগরে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে চলেছে তারা।
এছাড়া বঙ্গোপসাগর ঘিরে রচিত রয়েছে আঞ্চলিক সংগঠন বিমসটেকের কর্মসূচি।
আসিয়ানের কিছু দেশও এই সাগর তীরেই অবস্থিত। অর্থাৎ এই উপসাগরের তীরবর্তী প্রতিটি দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ভূ-রাজনৈতিক ভাবেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর।
বাংলাদেশের জলসীমাতে ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস হাইড্রেটের সন্ধান মিলেছে এখানে। রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনাও।
এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের জলসীমাতেও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। আর, এজন্যই এই উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করবে এই উপসাগর কেন্দ্রিক বাণিজ্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ শতাংশ। পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এই বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো উন্নত হতে পারে৷ উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপাদানই এখানে রয়েছে।
এই উপসাগরের তীরেই বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে৷ বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক চতুর্থাংশের জলসীমা দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাছাড়া বিপুল পরিমাণ মৎস সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র এই উপসাগর।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্বের বড় শক্তিধর দেশগুলোর আগ্রহ বাড়ছে বঙ্গোপসাগরের প্রতি। সেই সাথে উপসাগরের কোলে থাকা বাংলাদেশের প্রতিও আগ্রহী দেশগুলো।
বাংলাদেশেকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। পররাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী কারো পক্ষে না গিয়ে কৌশলের সাথে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
তবে দিন যত গড়াবে বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বাড়তেই থাকবে। এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকেরা।
বিশ্ব পরাশক্তিদের এই তৎপরতা কতোটা সফল হবে বলে আপনি মনে করেন? এই উপসাগরে রাজত্ব করবে কে? যুক্তরাষ্ট্র, ভারত নাকি চীন? আপনাদের মতামত জানাতে পারেন কমেন্ট বক্সে।