রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোকয়েলহাট গ্রামে দুই বছরের শিশু সাজিদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ৩২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান শেষে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আজ শুক্রবার সকাল থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন ছুটে আসেন সাজিদের জানাজায় অংশ নিতে। সকাল সাড়ে ১০টায় জানাজা শেষে তাকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল মা রুনা খাতুন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নার পর তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে তার। চারপাশে শোকাহত আত্মীয়স্বজন একে অপরকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, কিন্তু কারও চোখের পানি থামছিল না।
৩০ বছর ধরে এই গ্রামে বসবাস করছেন সাজিদের পরিবার। রুনা ও রকিবুল ইসলামের দুই ছেলে—নয় বছরের বড় ছেলে, তিন মাস বয়সী ছোট সন্তান। সাজিদ ছিল তাদের মেজো ছেলে।
ভাঙা গলায় রুনা বললেন, “আমার সাজিদ খুব চঞ্চল ছিল। সবকিছুতে ওর আগ্রহ ছিল।” এরপরই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাজিদের বাবা রকিবুল গাজীপুরে একটি গুদামে কাজ করেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি এলাকায় ছিলেন না।
বুধবার দুপুরে মাটি বোঝাই একটি ট্রলি হঠাৎ দেবে গেলে সেখানে একটি সরু গর্ত দেখা যায়। রুনা খাতুন সাজিদের হাত ধরে সেটা দেখতে যান। রুনা বলেন, একটু পর সাজিদ ‘মা’ বলে চিৎকার করে গর্তে পড়ে গেল। প্রথমে ভেবেছিলাম পুকুরে পড়েছে। পরে গর্তের ভেতর থেকে ক্ষীণ আওয়াজ শুনে সবাইকে ডাকলাম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গর্তগুলো ছিল ভূগর্ভস্থ পানি পরীক্ষার জন্য খনন করা পুরোনো নমুনা গর্ত। স্থানীয় কছিরউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি টিউবওয়েল বসানোর উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে এগুলো খনন করেছিলেন। তবে গর্তগুলো ভরাট করা হয়নি। দুর্ঘটনার পর এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান, এখনো পলাতক। ফায়ার সার্ভিস জানায়, বারবার মাটি ধসে পড়ায় উদ্ধারকারীদের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
তানোর ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ আব্দুর রউফ বলেন, শিশুটিকে পরে ৪৫ ফুট গভীরে পাওয়া যায়। সম্ভবত অক্সিজেনের অভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। আমরা যাওয়ার আগেই স্থানীয়রা খননচেষ্টা করায় গর্ত ধসে যায়। ফলে আমরা যে অক্সিজেন দিচ্ছিলাম, তা নিচ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না সাজিদের বাবা রকিবুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গর্তটা যদি ভরাট করা থাকত, তাহলে এটা হতো না। আমার ছেলেটা যদি ১০–১৫ ফুট নিচেও থাকত, বাঁচানো যেত। কিন্তু সে ৪০ ফুট নিচে ৩২ ঘণ্টা পড়ে ছিল। আমি বিচার চাই, যেন আর কোনো পরিবার এভাবে সন্তান না হারায়।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও একই দাবি জানান। রকিবুলের ফুফু শেফালি বলেন, এভাবে গর্ত ফেলে রাখা অপরাধ। আমাদের পরিবার শেষ হয়ে গেল। আমরা সাজিদের মৃত্যুর বিচার চাই।