কাজের সন্ধানে সীমান্ত পাড়ি- আর সেই পথেই ওঁৎ পেতে থাকে মৃত্যু। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর ‘র্যাটহোল’ যেন সুনামগঞ্জ সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য এক নিঃশব্দ মৃত্যুকূপ। কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এসব বিপজ্জনক সুড়ঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন শত শত মানুষ।
র্যাটহোল হলো পাহাড়ের ভেতরে প্রায় ৫০০ ফুট লম্বা ও মাত্র ৩ ফুট চওড়া সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ। ইঁদুরের গর্তের মতো এসব পথে হামাগুঁড়ি দিয়ে বা নুয়ে ঢুকে গাঁইতি–শাবল দিয়ে কয়লা তুলতে হয় শ্রমিকদের। অবৈধ ও সম্পূর্ণ অনিরাপদ এই কাজে একটু ভুল মানেই পাহাড়ধস, শ্বাসরোধ কিংবা নিশ্চিত মৃত্যু।
সরকারি হিসাবে, গত এক বছরে সীমান্তের ওপার থেকে কয়লা আনতে গিয়ে অন্তত চারজন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের নুর মিয়া ছিলেন এমনই একজন। সাত সদস্যের পরিবার চালাতে চলতি বছরের মে মাসে তিনি র্যাটহোলে কাজে যান। কাজ শুরুর মাত্র দুদিন পরই পাহাড়ধসে তার মৃত্যুর খবর আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে স্বজনদের।
নুর মিয়ার স্ত্রী মাফিয়া বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটে। নুর মিয়ার মা কমলা বেগমও ছেলের মৃত্যুর জন্য কর্মসংস্থানের অভাবকে দায়ী করেন।
বাবার মতো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যেন অবৈধ কাজে যেতে না হয় এই ভয়েই বড় ছেলেকে সিলেট শহরে শ্রম বিক্রি করতে পাঠিয়েছেন মাফিয়া বেগম।
নুর মিয়া একা নন। একই গ্রামের মো. আব্দুল খালেকের ছেলে নুরুল হক দুই বছর আগে র্যাটহোলে কয়লা তুলতে গিয়ে মাটি চাপায় মারা যান। তার বড় ভাই মো. আতাউল্লাহ বলেন, কাজের অভাবে মানুষ মরতে মরতে র্যাটহোলে যাচ্ছে। অন্য কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই।
তাহিরপুর সীমান্তের ট্যাকেরঘাট, লালঘাট, লাকমা, বাগলী, রজনীলাইন, চাঁনপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়াচ্ছেন। তারা ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ভেতরে নোকলা, কুলাংসহ পরিত্যক্ত র্যাটহোলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
বিজিবির নজরদারি এড়িয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় কাজের সংকট ও কম মজুরিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহজলভ্যতা এই মৃত্যুঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সুনামগঞ্জ–২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির জানান, সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তব চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
স্থানীয়দের দাবি, মেঘালয়ের র্যাটহোল থেকে শ্রমিকদের ফেরাতে সুনামগঞ্জের সীমান্ত গ্রামগুলোকে ঘিরে বড় পরিসরে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এক ফসলি বোরো নির্ভর এই জনপদে কৃষির বাইরে কাজের সুযোগ না বাড়লে, জীবন বাজি রেখে মৃত্যুর পথে হাঁটা থামবে না—এমন আশঙ্কাই করছেন তারা।
- প্রতিবেদন: তুর্য দাস, সুনামগঞ্জ