দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরী ও তরুণীদের স্বপ্ন দেখা, আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কুড়িগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে গার্লস ড্রিম ফেয়ার–২০২৫।
‘স্বপ্ন দেখো, পথ তৈরি করো’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আরডিআরএস বাংলাদেশ বাস্তবায়িত চাইল্ড, নট ব্রাইড (সিএনবি) প্রকল্পের উদ্যোগে রোববার ও সোমবার (১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর) দুই দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়। কুড়িগ্রাম শহরের আরডিআরএস চত্বরে আয়োজিত এ মেলায় সদর, রাজারহাট, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী—এই ছয় উপজেলার প্রায় ৯৬ জন কিশোরী ও তরুণী অংশগ্রহণ করেন।
মেলায় কুইজ প্রতিযোগিতা, অনুপ্রেরণামূলক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন ছিল। অংশগ্রহণকারী কিশোরীরা তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকি মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার গল্প শোনান তারা। বিভিন্ন বক্তা কিশোরীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সম্পর্কে পরামর্শ দেন।
বক্তারা জানান, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চাইল্ড, নট ব্রাইড প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) মেলার উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিএম কুদরত-ই-খুদা। উদ্বোধনী দিনে বক্তব্য রাখেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের হেড অব ব্রডকাস্টিং নায়লা পারভীন পিয়া, জেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমান, এমজেএসকেএস-এর ডেপুটি ডিরেক্টর মইনুল হক এবং সিএনবি প্রকল্পের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মাহমুদুল হাসানসহ অন্যান্য অতিথিরা।
বক্তারা বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন। মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসই তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
উলিপুর থেকে আগত অংশগ্রহণকারী ময়না আক্তার বলেন, ২০২৩ সালে ইন্টার পাস করার পর তিনি ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত হন এবং অনার্সে ভর্তি হন। পরে সিএনবি প্রকল্পের মাধ্যমে চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কাজ করছেন। এ কাজে আরডিআরএস তাকে সহযোগিতা করছে বলে জানান তিনি।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) মেলার দ্বিতীয় দিনে উপস্থিত ছিলেন বিডিজবস ডটকমের এজিএম মোহাম্মদ আলী ফিরোজ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর শরিফা খাতুন। এছাড়া ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের প্রধান ড. শারমিন আক্তার, টেকনিক্যাল অফিসার আব্দুল মোমিন এবং প্রকল্প সমন্বয়কারী অলিক রাংসা ও মাহমুদুল হাসান।
মোটিভেশনাল বক্তব্যে মোহাম্মদ আলী ফিরোজ বলেন, বর্তমান চাকরির বাজারে টিকে থাকতে দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সুপরিকল্পনা জরুরি। লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিজেকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর শরিফা খাতুন বলেন, একজন নারী হয়েও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। তিনি বলেন, গ্রামের মেয়েরাও জীবনের সঙ্গে ও সমাজের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা মেয়েদের নিজেদেরই দায়িত্ব। কুড়িগ্রামকে ‘মঙ্গা এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করার ধারণা বদলে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয় এবং সব অংশগ্রহণকারীর হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। সমাপনী বক্তব্য দেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়ুথ লিড টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট শারমিন মমতাজ।