সারাদেশ


‘হিন্দু যুবকদের দ্বারা মুসলিম নারী ধর্ষণ’— প্রচলিত দাবির সঙ্গে অমিল


খেলা ডেস্ক

খেলা ডেস্ক

প্রকাশিত:২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার

‘হিন্দু যুবকদের দ্বারা মুসলিম নারী ধর্ষণ’— প্রচলিত দাবির সঙ্গে অমিল

ছবি: সংগৃহীত


ধামরাইয়ে এক মুসলিম গৃহবধুকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়। বিশেষ করে “হিন্দু যুবকদের দ্বারা মুসলিম নারী ধর্ষণ” এই বয়ান ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দ্রুত সাম্প্রদায়িক রঙ নিতে শুরু করে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে ঘটনা খতিয়ে দেখে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে অনেকটাই সাংঘর্ষিক।

ঘটনার বিষয়ে প্রথমে দৈনিক যুগান্তর, পরে দেশ রূপান্তর ও আমার দেশ এই তিনটি পত্রিকায় প্রায় একই ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিরোনাম আলাদা হলেও মূল বর্ণনা প্রায় হুবহু এক। আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও ভুক্তভোগী নারী বা তাঁর স্বামী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির সরাসরি বক্তব্য ছিল না। সব তথ্য এসেছে নামহীন ‘সংশ্লিষ্ট সূত্র’ কিংবা ‘স্থানীয় সূত্র’ থেকে।

 

ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রতিবেশী, ইউপি সদস্য, ঘরের মালিক, এমনকি স্বামী পরিচয় দেওয়া আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া গেছে। কেউই নিশ্চিত করে ধর্ষণের ঘটনার কথা বলেননি। এমনকি আব্দুর রাজ্জাক নিজেও বলেছেন, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানেন না এবং তিনি কাউকে এমন কথা বলেনওনি।

 

রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে কয়েকজন অচেনা ব্যক্তি ঘরে ঢুকে তাঁকে মারধর করে এবং টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। তাঁর স্ত্রীকে বাইরে নিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেয়। পরে স্ত্রী শুধু জানান, গহনা ও টাকা লুট হয়েছে কোনো শারীরিক নির্যাতনের কথা তিনি বলেননি।

 

প্রতিবেশীরাও একই কথা বলেছেন। তারা মারধর ও লুটপাটের কথা শুনেছেন, কিন্তু ধর্ষণের কোনো তথ্য পাননি। কেউ কাউকে খুঁটিতে বেঁধে রাখার চিহ্নও দেখেননি।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামলাকারীদের পরিচয় কেউই জানে না। তারা মুখ ঢাকা অবস্থায় ছিল, ঘরের লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল। ভুক্তভোগী কিংবা স্থানীয় কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তারা মুসলিম না হিন্দু। ফলে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় পরিচয় জুড়ে দেওয়া পুরোপুরি অনুমাননির্ভর।

 

আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে রাজ্জাকের সঙ্গে থাকা নারীর পরিচয় নিয়ে। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজ্জাকের প্রকৃত স্ত্রী ওই রাতে তাঁর সঙ্গে ছিলেনই না। তিনি অন্য এক নারীর সঙ্গে ছিলেন, যাঁর নাম-পরিচয় এখনো অস্পষ্ট। এতে পুরো ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

 

ঘটনা পরিদর্শনের পর ধামরাই থানা জানিয়েছে, তারা ধর্ষণ বা কোনো ধরনের যৌন নিপীড়নের প্রমাণ পায়নি। ওসি নাজমুল হুদা খান স্পষ্টভাবে বলেছেন, পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটি একটি ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা, এর বাইরে কিছু নিশ্চিত হওয়া যায়নি। থানায় এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগও জমা পড়েনি।

 

যে ব্যক্তির সূত্রে প্রথম সংবাদটি ছড়িয়েছে, তার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ সেই যাচাইহীন সূত্রের ওপর ভর করেই তিনটি জাতীয় দৈনিকে একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে যা সাংবাদিকতার ন্যূনতম যাচাইয়ের প্রশ্ন তোলে।

 

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপর্যাপ্ত যাচাইয়ের ভিত্তিতে একটি স্পর্শকাতর ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধান বলছে, এটি মূলত একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা, কিন্তু সেটিকে ‘ধর্মীয় পরিচয়’ জুড়ে দিয়ে ধর্ষণের গল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।

 

এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয় সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, সামাজিক দায়ও। একটি ভুল বা অতিরঞ্জিত প্রতিবেদন মুহূর্তেই সমাজে বিভাজন, ভয় আর ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।


সম্পর্কিত

গৃহবধু ধর্ষণধর্ষণ

জনপ্রিয়


সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

শেরপুর -৩ আসনে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না ভোটের মাঠে, শেষ পর্যন্ত জিতবেন কে

শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের স্থগিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের প্রচারণা তুঙ্গে উঠেছে। আগামী ৯ এপ্রিল ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় শেষ মুহূর্তের গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক চলছে। ভোটের মাঠে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি নয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অটো পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, উপাচার্যকে হেনস্তার অভিযোগ

আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (পাস) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা অটো পাসের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এই সময় শিক্ষার্থীরা উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহকে হেনস্তা করার পাশাপাশি তাঁর গাড়িতে ভাঙচুর করার অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

‘এবার পরীক্ষায় নকল হবে না’– শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবার পরীক্ষায় নকল হবে না। কারণ নকল মূলত শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়—যারা এটি বন্ধ করেছে, সেই শিক্ষকরাই কখনও নকল করিয়েছে।”

বহিষ্কারের পর ছাত্রদল নেতার দাবি—‘আমি ট্রান্সজেন্ডার নই, গুজব ছড়ানো হচ্ছে’

কসবা উপজেলা-এ ছাত্রদলের এক নেতাকে বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বহিষ্কৃত নেতা রেদোয়ান ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি ট্রান্সজেন্ডার নন এবং তাকে ঘিরে ছড়ানো তথ্য সম্পূর্ণ গুজব।