এক্সক্লুসিভ
মানুষকে সাহায্যেই সুখ, মিস করেন মাটি-মাকে
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করায় এক বাইকারকে ফিল্মি স্টাইলে ধাওয়া করে বিভিন্ন মহলে প্রশংসা পেয়েছিলেন। এরপর কখনও তাকে দেখা গেছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে, কখনও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে, কখনও বা বাইক রেস করতে। গণপরিবহনের চালকদেরও স্যার বলে সম্মোধন করেন তিনি, বিশ্বাস করেন সকলে সচেতন হলে বদলে যাবে সড়কের চেহারা। বলছি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সেই সার্জেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কথা। সাম্প্রতিক সময়ের দর্শকপ্রিয় ভ্লগারদের মধ্যে একজন এই পুলিশ সদস্য।
নিজের ভ্লগিং, কার্যক্রম, পছন্দ-অপছন্দ সব কিছু নিয়ে দূরবীন নিউজের সঙ্গে আলাপ করেন তিনি। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন দূরবীনের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হুমায়ুন কবির মাসুদ, ক্যামেরায় ছিলেন মেহফুজ উদ দৌলা টিটু।
দূরবীন নিউজ: আপনি একজন পুলিশ সার্জেন্ট। চাকরির পাশাপাশি ভিডিও কন্টেন্ট বানানোর চিন্তা কিভাবে মাথায় এলো?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমি যখন রাস্তায় কাজ করি তখন যে বিষয়টি দেখতে পাই তা হলো আমরা দেখি পুলিশ সম্পর্কে নেগেটিভ কথা বলা। তখন আমার মনে হলো পুলিশ অনেক ভালো কাজ করে। যা শতকরায় ৭০,৮০ কিংবা ৯০ শতাংশ। তবে একজন বা দুইজনের কারণে আমাদের সবাইকে দুর্নামের ভাগিদার হতে হয়। কিন্তু আমি চাই মানুষ যেন পুলিশ নিয়ে নেগেটিভ কোন মন্তব্য করতে না পারে। পুলিশের ভালো কাজের তথ্যগুলো জানান দেয়ার জন্য ভিডিও কনটেন্ট বানানোর চিন্তা মাথায় আসে। এটাকে আমি ভ্লগিং বলবো না এটি এওয়ারনেস (সচেতনতা)। মানুষকে বোঝাতে চাই যে পুলিশ ভালো কাজ করে এবং মানুষের জন্য কাজ করে।
দূরবীন নিউজ: আমরা যতটুকু জানি সার্জেন্টদের চাকরি ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করতে হয়। এর পাশাপাশি কিভাবে আপনি ভ্লগিংয়ের সময় বের করেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: সব সময় তো হিউজ ট্রাফিক থাকে না। হয়তোবা রমজানের কারণে প্রচুর পরিমাণ ট্রাফিক এখন। তাছাড়া কিছু সময় থাকে রিলাক্স টাইম, আর আমাদের আট ঘন্টা ডিউটির পর সময় বের করি এবং এই সময় আমি মানুষের উপকারের জন্য ভ্লগিংয়ের সময় বের করি। এছাড়া হেল্পলেস, পঙ্গু শিশু যাদের দেখার কেউ নেই, আমাদের তাদের এভয়েড করার সুযোগ নেই। যারা হেল্পলেস মানুষ আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই। আমার ভ্লগ দেখে একজন মানুষও যদি উপকৃত হয় তবে আমি স্বার্থক।
দূরবীন নিউজ: ভ্লগিংয়ে আপনাকে কে অনুপ্রাণিত করেছিল?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: ভ্লগিংয়ে আমাকে কেউ অনুপ্রাণিত করেনি। তবে আমি যতটুকু দেখেছি ভ্লগিংয়ে স্মার্টনেস নিয়ে কাজ করা, জনগণের জন্য কাজ করা, মানবিকতা নিয়ে কাজ করা। যেমন আমাদের সোলায়মান সুখন ভাই, আইমান সাদিক, তৌহিদ আফ্রিদী, পুলিশের একজন ছিল মানবিক শওকত। মূলত তাদেরকে দেখেই ইন্সপায়ার হয়েছি।
দূরবীন নিউজ: আপনি কি চাকরির শুরু থেকে ভ্লগিংয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: না। আমি চাকরির পূর্বে কখনো এ বিষয়ে চিন্তাও করিনি। তবে এখানে এসে দেখলাম আমরা (পুলিশ) যে কাজটি করছি বা যে কাজটি সরাসরি জনগণের সাথে সংযুক্ত সে তথ্যগুলো প্রত্যেকটি মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। বিভিন্ন সংস্থা যেমন মার্কেটিং করছে, কিন্তু আমরা কোনো মার্কেটিং করি নাই। আমি শুধু চাই যে আমাদের ভালো কাজগুলো মানুষ দেখুক।
দূরবীন নিউজ: আমি যতটুকু জানি আপনার চ্যানেলটি গুগল ভেরিফাইড। আপনি ভ্লগিং করে এভারেজ মাসে কত টাকা ইনকাম করেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমার চ্যানেল থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা আসে। আমি আমার সে টাকাগুলো গরীব মানুষদের দিয়ে দেই। আজও অলরেডি ৫০০ টাকা দিয়েছি। তাছাড়া যারা ক্যামেরায় ফুটেজ নিয়ে দেয়, তাদের যাতায়াতের খরচ দিতে হয়।
দূরবীন নিউজ: আপনি কি বিবাহিত?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: হ্যা আমি বিবাহিত। আমার অনাগত সন্তান আসবে সামনে। সকলে তার জন্য দোয়া করবেন।
দূরবীন নিউজ: আপনি প্রতিদিন কি কি কাজ করেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমি প্রতিদিন ওয়ার্ক আউট দিয়ে দিন শুরু করি। সকালে ডিউটি থাকলে বিকালে ওয়ার্ক আউট করি, বিকালে ডিউটি থাকলে সকালে করি। আমি এক্সারসাইজ এবং বডি বিল্ডিং এগুলো নিয়ে কাজ করছি।
দূরবীন নিউজ: আপনি কি অন্যদেরও ভ্লগিং করতে উদ্বুদ্ধ করবেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমি শুধু ভ্লগিং নিয়ে বলবো না যে কেউ চাইলে পার্সোনাল ব্রান্ডিং, যে কেউ চাইলে ফেসবুকের মাধ্যমে কন্টেন্ট ক্রিয়েট করতে পারেন। আর যদি কোন ভালো কাজ থাকে তবে তা মানুষকে দেখাবেন। আবার চাইলে আপনি সাইলেন্টলি করতেও পারেন। আপনার ভালো কাজ দেখে অন্যজন শিখবে।
দূরবীন নিউজ: ভিডিওর মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করেন। কিন্তু আপনার কি মনে হয় ব্যক্তিগতভাবে সচেতন না হলে এসব ভিডিও কাজে দিবে?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমি মনে করি ব্যক্তিগত সচেতনতা সবার আগে। আপনি যদি সচেতন না হোন তাহলে আমাদের ভিডিও করে কোন কাজই হবে না। সে যা করুক আর যত বড় ভ্লগারই হোক না কেন মানুষের মাঝে সচেতনতা না আসলে আমাদের ভিডিও কোন কাজেই আসবে না। আপনারা নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করুন এবং সুশিক্ষিত হোন, মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেন। দেশ ও দেশ মাতৃকার জন্য কাজ করেন।
দূরবীন নিউজ: বর্তমান তরুণ সমাজের জন্য আপনি কি কোন মেসেজ দিতে চান ভ্লগিং কিংবা বাইক নিয়ে?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: বাইক স্ট্যান্ড একটি আর্ট। দেশের বাইরে বাইক রেসের জন্য আলাদা সড়ক আছে, আলাদা প্লাটফর্ম আছে। বাংলাদেশেও কিন্তু ডে বাই ডে হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এটির ওপর আকৃষ্ট হচ্ছে। এটাকে স্পোর্টস হিসেবে গণ্য করা গেলে, যেমন অভিক আনোয়ার যিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোটরসাইকেল চেইস করেন। আমরা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে গেলে তার জন্য গর্ববোধ করি। যে সে আমাদের দেশকে অন্য দেশের সামনে তুলে ধরছে। তার মত আরও তরুণরা এগিয়ে আসলে বাংলাদেশে এটি একটি শিল্প হতে পারে তাছাড়া আমাদের রেমিটেন্সের জন্যও কাজে দিবে।
দূরবীন নিউজ: পুলিশ সদস্য হিসেবে চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পথযাত্রী সকলের জন্য ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য কি উপদেশ বা অনুরোধ করবেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: এটা যার যারটা তাকেই মানতে হবে। তবে আমি মনে করি ‘আসুন আমরা সকলে ট্রাফিক আইন মেনে চলি। ট্রাফিক আইন মানলে দেখবেন রাস্তায় দুর্ঘটনা কমে যাবে। আমি কিন্তু কোন ড্রাইভারকে সাধারণত ভাই বলি না আমি সবসময় স্যার বলে সম্মোধন করি। আমাদের পশ্চিমা বিশ্বের মতো স্যার বলেই সম্মোধন করা উচিত। ভুল একটা ধারণা আছে যে স্যার মানে প্রভু আসলে তা নয়। স্যার বলা মানে ছোট হওয়া নয়।
দূরবীন নিউজ: আপনার বাড়ি গাংনী, মেহেরপুর। গ্রামকে কেমন মিস করেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আমি গ্রামকে অনেক বেশি মিস করি। আমাদের (পুলিশ) ছুটি খুবই কম। আর ছুটি থাকলেও রাস্তার ট্রাফিক সমস্যার কারণে যেতে পারি না। আমরা রাস্তাকে ফেলে দিয়ে যদি বাড়িতে চলে যাই তাহলে মানুষ অনেক বেশি সাফার করবে। তারপরও যখনই ছুটি পাই তখনই গ্রামে ছুটে যাই। প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করি। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মায়ের কথা। মা আমাকে কিছুক্ষণ আগেও ফোন দিয়েছিল কিন্তু রিসিভ করে শুধু বলছি যে রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম আমি পরে কথা বলবো।
দূরবীন নিউজ: কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: বাংলাদেশকে গতিশীল, ডায়নামিক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখতে চাই। যে বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত থাকবে। আমি মনে করি এ বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ সকলকে সম্মান করবে। আমরা একটা ফকির, মিসকিনকেও সম্মান করবো । এই সম্মানটুকু দিতে পারলেই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
দূরবীন নিউজ: উন্নতির চূঁড়ায় পৌছাতে হলে কি করতে হবে?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে এটুকু বলবো, মিউচুয়াল রেসপেক্ট এবং ওয়ার্ক করতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদেরও অলসতা ছেড়ে দিয়ে কাজ করতে হবে। সকলকে ফিট থাকতে হবে, সবচেয়ে বেশি কাজের বা কর্মের প্রতি সম্মান থাকতে হবে। যে পেশারই হোক না কেন কাজের জায়গাটাকে যদি সঠিকভাবে পালন করি তবেই দেখবেন আমরা আরও উন্নতি করছি।
দূরবীন নিউজ: কি দেখে আপনি এই কাজে এগিয়ে আসলেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: আসলে আমি যখন দেখি মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় থাকেন, এ বিষয়টি খুব খারাপ লাগে। আর আমাদের দেশ নাকি এত উন্নত তাহলে আমাদের দেশের রাস্তায় কেন ভিক্ষুক থাকবে? তো এই মানুষগুলোকে দেখলে আমার খুবই খারাপ লাগে। আমরা যেহেতু রাস্তায় থাকি সেহেতু অনেক গরিব মানুষের সাথে দেখা হয়। তাদের সাথে চলি। আগে মানুষ পুলিশ দেখে ভয় পেত কিন্তু বর্তমানে মানুষ পুলিশের কাছে আসছে এবং তাদের সাথে কথা বলছে। কোন হেল্প লাগলে পুলিশের কাছে গিয়ে বলছে। এমন অনেকেই আছে যারা রাস্তা চিনে না আমি তাদের সাহায্য করেছি। যার ফলে বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরী হয়েছে।
দূরবীন নিউজ: পুলিশের চাকরিতে এসে সবচেয়ে কিসে সুখ পেয়েছেন?
সার্জেন্ট সাদ্দাম: রাস্তায় কাউকে সহযোগিতা করতে পারলেই আমার সবচেয়ে সুখের সময়।
জনপ্রিয়
এক্সক্লুসিভ থেকে আরও পড়ুন
ঝিনাইগাতী গারো পাহাড়ে জ্বলছে আগুন, জীববৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন
গতকাল শুক্রবার ঝিনাইগাতী-কামালপুর সড়কের ময়মনসিংহ বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জের গজনী বিট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের চারটি স্থানে বড়আকারে আগুন জ্বলছে।
বিধবাপল্লীতে পুলিশ সুপারের ঈদ উপহার বিতরণ
উপহার সামগ্রীর মধ্যে ছিল- শাড়ী, লুঙ্গি, চাল, সেমাই, নুডলস, চিনি, গুড়ো দুধ ও সাবান।
লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ১, আহত ২
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের বুড়িরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মুরুলী চন্দ্র (৪২) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও দুইজন।
উদারতার দৃষ্টান্ত: রমজানে ফিতরার তাৎপর্য
বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের ধনী-গরিবের আর্থসামাজিক বৈষম্য পরিহারের লক্ষ্যে ইবাদতের এ মাসে মহান রাব্বুল আলামীন দান-সদকা, জাকাত-ফিতরার মতো সুন্দরতম বিধান ও আমল দিয়েছেন মুমিনদের জন্য।
.jpg)







