এক্সক্লুসিভ
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিঃ ৯ বছরেও ভাগ্য ফেরেনি শ্রমিকদের
জাহাঙ্গীর সুমনঃ
বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে যাওয়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছরেও শেষ হয়নি বিচার কাজ, দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকেরা পায়নি ক্ষতিপূরণ। নয় বছরেও কী পরিমাণ অর্থ একজন ভুক্তভোগীকে দেওয়া হবে, এ বিষয়ে আজও সমাধান হয়নি। ফলে ঝুলে আছে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আটতলা রানা প্লাজা ধসে নিহত হন এক হাজার ১৩৫ জন; প্রাণে বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় আরও হাজারখানেক গার্মেন্টস শ্রমিককে।
রানাপ্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনায় সর্বমোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়। রানা প্লাজা ধসের দিনই সাভার থানায় দুটি মামলা হয়। পরের বছর দুর্নীতি দমন কমিশন দায়ের করে আরেকটি মামলা। প্রথমটিতে হতাহতের ঘটনা উল্লেখ করে ভবন ও কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন সাভার মডেল থানার এসআই ওয়ালী আশরাফ। আর রাজউক কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের দায়ের করা অন্য মামলাটিতে ভবন নির্মাণে ত্রুটি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
‘অবহেলা ও অবহেলাজনিত হত্যার’ অভিযোগে মামলা দায়েরের দুই বছর পর ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় সাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। আসামিদের মধ্যে আবু বক্কর সিদ্দিক ও আবুল হোসেন মারা যাওয়ায় এখন আসামির সংখ্যা ৩৯ জন। মামলাটি আসামি পক্ষের উচ্চ আদালতের রিটের কারণে মামলার বিচার কাজ আটকে ছিল। নয় বছর হাই কোর্টের স্থগিতাদেশ কাটিয়ে মাস তিনেক আগে শুরু হয় এ মামলার বিচার। ১১ এপ্রিল ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ মামলার বাদী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের উপ পরিদর্শক ওয়ালী আশরাফের সাক্ষ্য শেষ হয়। তিনি এই মামলায় প্রথম সাক্ষ্য প্রদান করেন। মামলার বিচার করছেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূইয়া।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিমল সমাদ্দার জানান, সেদিন বাদী আদালতে হাজির থাকলেও সোহেল রানাকে হাজিরে ব্যর্থতায় বিচারক সাক্ষ্য নিতে পারেননি।
আইন অনুযায়ী, আসামিদের সামনে সাক্ষ্য করার নিয়ম রয়েছে। বিচারের সময় জামিনে থাকা আসামি জান্নাতুল ফেরদৌস, আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, জামশেদুর রহমান, ইউসুফ আলী, উত্তম কুমার রায়, নয়ন মিয়া, বেলায়েত হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ, মধু, রকিবুল হাসান রাসেল, রফিকুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান তাপস, আওলাদ হোসেন মর্জিনা বেগম, সারোয়ার কামাল, অনিল দাস আদালতে হাজির থেকে বিচারের মুখোমখি হচ্ছেন।
এ মামলার আসামি রানার বাবা মো. আব্দুল খালেক ওরফে খালেক কুলু এবং আতাউর রহমান মারা গেছেন। আরেক আসামি সাভারের সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহর স্থগিতাদেশ বিষয়ে হাই কোর্টে থেকে কোনো কাগজ পায়নি বিচারিক আদালত। আসামি মাহবুবুর রহমান, ফারজানা ইসলাম, মো. শফিকুর ইসলাম ভূইয়া, মেনোয়ার হোসেন বিপ্লব, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কনট্রাকটর , আবু বকর সিদ্দিক, মো. আবুল হাসান, মোহাম্মদ আলী খান, বজলুল সামাদ পলাতক রয়েছেন।
এতদিন ৩৯ আসামির মধ্যে মামলার বিচারে শুধু দুইজনের পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ থেমে ছিল।
এদিকে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আনোয়ারুল কবির বাবুল জানান, রানার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা ও মাদকের মামলাও বিচারাধীন। দুর্ঘটনার পর যে কয়েকটি মামলা হয়েছে, তার মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলায় সাজা হয়েছে রানা ও তার মায়ের। সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় রানার তিন বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস এ রায় দেন।
আর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মামলায় রানার মা মর্জিনা বেগমকে ছয় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তার সম্পদের ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯০ টাকা বাজেয়াপ্ত করেন বিচারক।
ক্ষতিপূরণের কি হবে:
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেঁচে যাওয়া ২০০ জনের মধ্যে একশন এইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক জরিপে জানা যায়, রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকদের বেশিরভাগের আয় করোনা মহামারির প্রভাবে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ৬৩.৫ শতাংশ বলেছেন, মহামারি চলাকালীন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের কাছে ছিল না। ৫১.৫ শতাংশ বলেছেন, তারা নিয়মিত ঘর ভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি এবং ২২.৫ শতাংশ বলেছেন, তারা সন্তানের সঠিক যত্ন নিতে পারেননি। ৪৬.৫ শতাংশকে মহামারি চলাকালীন তাদের পরিবারের খাবার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য ঋণ করতে হয়েছে। এছাড়া দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের ৫৬.৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, যা গত বছর ছিল ১৪ শতাংশ। বর্তমান জরিপে ৫৬.৫ শতাংশের মধ্যে যারা তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন, তারা কোমর, মাথা, হাত-পা এবং পিঠে ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।
একশন এইড বাংলাদেশ পরিচালিত জরিপে, মো. মনির হোসেন নামে পোশাক শ্রমিক জানায় রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপে আটকে ছিলেন তিনি। তিন দিন পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনি শরীরের নানারকম জখম নিয়ে আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারখানায় আর ফেরা হয়নি, এখন কিছু সময় কাটান ফুটপাতে নানারকমের ছোটখাটো কাজ নিয়ে। ঘরে খাবার নেই, সন্তানদের পড়ালেখার ব্যবস্থা নেই। মনির দুই দফায় এক লাখ টাকা পেয়েছিলেন। তার প্রশ্ন, কাজে থাকার সময় যে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতেন, তার বিপরীতে এই লাখ টাকা আসলে তার কী সহায়তা করলো?
কেবল মনির নয়, রানা প্লাজাসহ কারখানার নানা দুর্ঘটনায় আহতদের মুখে একই প্রশ্ন শোনা যায় বিভিন্ন সময়। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু আসলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলো কখন বলা যাবে, কী পরিমাণ অর্থ একজন ভিকটিমকে দেওয়া হবে, এ সব বিষয়ে আজও সমাধান হয়নি।
আইনে শ্রমিকদের সুযোগের থেকে মালিকদের সুযোগ বেশি উল্লেখ করে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার জানান, ‘ক্ষতিপূরণের নামে যে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটা মোটেই যুগপোযোগী না। এই অর্থ দিয়ে আহত শ্রমিকের চিকিৎসা খরচই ওঠে না, সেখানে সে পুনর্বাসিত হবে কীভাবে?’ করণীয় বলতে গিয়ে এই নেতা বলেন, ‘যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সবই মালিকের অবহেলাজনিত কারণে ঘটেছে। কম মজুরি দিয়ে কাজ করে। মানুষের ওপরে ভর দিয়ে, ঠকিয়ে কোনও ইন্ডাস্ট্রি টিকবে না। যাদের ওপর ভর করে আয় করছেন, তাদের নিরাপত্তা, বেতনভাতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকতেই হবে।’
অরকা’র মানবিক উদ্যোগ:
সাভারে রানা প্লাজা ধসে বাবা-মা হারানো এতিম ৫৬ শিশু-কিশোরকে নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন; যারা তাদের শিক্ষা, খাদ্যসহ যাবতীয় বিষয়াদি দেখভাল করছে।
ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন বা অরকা নামের সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসব শিশুদের নিয়ে এসেছে তাদের গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের হোমসে।
২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর হোসেনপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এস আই এম জাহান ইয়ারের প্রচেষ্টায় স্থাপিত হয় এই ‘অরকা হোমস’। শিশুদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
অরকা হোমস কর্তৃপক্ষ জানায়, সেসময় প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলা দুটি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এখানে ৩২ জন ছেলে ও ২৪ জন মেয়ে রয়েছে। এসব শিশু-কিশোর লেখাপড়া করছে অরকা হোমস ক্যাম্পাসে অবস্থিত হোসেনপুর মুসলিম একাডেমিতে। একাডেমিতে রয়েছে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা। এই একাডেমিতে রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন ছাত্রছাত্রী ও ২০ শিক্ষক।
অরকা হোমস পরিচালক জাহেদুল ইসলাম বলেন, সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী শিশু-কিশোরদের তদারকি করছেন। এখানে বসবাসকারী শিশুদের লেখাপড়া শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দুইজন চিকিৎসক সপ্তাহে দুইদিন এখানে এসে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এসবের পাশাপাশি শীতবস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ প্রভৃতি সামাজিক কাজও করে থাকে অরকা।
অরকা হোমস এর মূল উদ্যোক্তা জাহান ইয়ার বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই এই কর্মসুচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়বে।
.jpg)
.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)