এক্সক্লুসিভ


কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার হ্যারিকেন


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:২৪ এপ্রিল ২০২২, ০৫:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার হ্যারিকেন

হুমায়ুন কবির মাসুদ:


‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে’ কথাটি শুনলে এখন আর সেই আগের গ্রামের কথা মনে পড়ে না। কেননা আধুনিকতা আর সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে সেই আগের দিনের সবকিছু। তারই ধারাবাহিকতায় হ্যারিকেন নামক শব্দটিও মুছে যেতে বসেছে গ্রামের জনপদ থেকে।


হ্যারিকেন একসময়ের রাতের আলোর একমাত্র মাধ্যম। ১৫০০ শতাব্দির পর থেকে পারস্যে ব্যাপক হারে ব্যবহারের পর সকল দেশে শুরু হতে থাকে হ্যারিকেনের ব্যবহার। বিশেষ করে গ্রাম্য এলাকায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের যতগুলো প্রতীক তারই মধ্যে একটি হ্যারিকেন।


বাল্য জীবনে বা নব্বইয়ের দশকের পরও হারিকেন বা কুপি বাতির আলোই ছিল অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। কিন্তু আধুনিক এ যুগে সেই হ্যারিকেন আজ বিলুপ্তির পথে। বাঙালির গ্রামীণ জীবনদশায় রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার দূর করতে একমাত্র ভরসা ছিল হ্যারিকেন, কুপি ও হ্যাজাক বাতি। যা জ্বালানোর একমাত্র উপাদান হলো কেরোসিন।


সে সময় এই হ্যারিকেনের আলোয় ভরসা করে গ্রামে বিয়ে সাদি থেকে শুরু করে যাত্রাগান, মঞ্চনাটক, ওয়াজ মাহফিলের মত অনুষ্ঠান করা হত। সন্ধ্যা হলেই হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ছোট ঘরের বারান্দায় বসে পড়াশোনা করতো বাচ্চারা। হ্যারিকেন যেহেতু কেরোসিনে জ্বলে তাই বাড়ির মুরুব্বিরা কাঁচের শিশিতে করে কেরোসিন আনতো। পরিবারের সবচেয়ে ছোটরা খুব সচেতন হয়ে মুছতো হ্যারিকেনের চিমনি।


এখনকার সময়ের শিশুদের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে হ্যারিকেন আবার কেমন? সহজ ভাষায় হ্যারিকেন হলো টিনের তৈরি দুটো খুটির ন্যায়, কাঁচের চিমনি বিশিষ্ট প্রদীপ। আনারসের মত দেখতে কাঁচের চিমনির নিচের অংশে টিনের তৈরি কেটলি। যেখানে কেরোসিন ঢালা হয়। একটি গোল ছিদ্রতে পাটের তৈরি শলতা দিয়ে তা কেরোসিনের সাথে যুক্ত করা হয়। যার এক চতুর্থাংশ ট্যাংকের তেলের মধ্যে ডুবানো থাকে। আর বাকি অংশ থাকে উপরে কাচের মধ্যে। দিয়াশলাই কিংবা আগুনের ছোয়ার সাথে সাথেই জ্বলে উঠে এটি।


বর্তমান সময়ে রেগুলেটরের মতো কমানো বাড়ানো যেত হ্যারিকেনের আলো। গ্রামের মুরুব্বিদের রাত বিরাতে চলাচলে একমাত্র অবলম্বন ছিল এটি। স্বামীর রাতে আসতে একটু দেরি হলেই হ্যারিকেনের আলো ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন স্ত্রী।


সমাজের অঢেল পরিবর্তন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি অগ্রগতি ও আধুনিকতায় গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী হ্যারিকেন এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বৈদ্যুতিক বাতি, চার্জার লাইট ও সৌর বিদ্যুতের নানা ধরণের ব্যবহারের ফলে হ্যারিকেনের ব্যবহার আজ আর আগের মত দেখা যায় না। তবে মজার বিষয় হলো গ্রামাঞ্চলে এখন যেমন হ্যারিকেন খুঁজে পাওয়া দূর্লভ ব্যাপার তেমনি কোন ঘরে বিদ্যুৎ নেই এমন গ্রামও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।


আর যদিও বা কোন ঘরে বিদ্যুত না থাকে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে সৌর বিদ্যুতের আলো বা চার্জার লাইট। গ্রামাঞ্চলে এখনও দু-এক বাড়িতে হ্যারিকেন দেখা গেলেও ব্যবহার না হওয়ায় এগুলো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। ছোটবেলার সেই কুপি-বাতির জীবন সবসময় স্মৃতির পাতায় পড়ে থাকবে সেই যুগের মানুষদের।


তবে মজার বিষয় হলো সেসময়ে কুপি থাকলেও চোখের সমস্যার পরিমাণ ছিল অতি সামান্য। গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী হ্যারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। হয়তো এক সময় গ্রামের একমাত্র কৃত্রিম আলোর উৎস হ্যারিকেনের দেখা মিলবে বাংলার জাদুঘরে।





জনপ্রিয়