এক্সক্লুসিভ
আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছেই!
হুমায়ুন কবির মাসুদ: মানুষ মরণশীল। পৃথিবীতে প্রত্যকেটি প্রাণীর মত মানুষও মৃত্যু বরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ঘটনা কিংবা আত্মহত্যার মৃত্যুগুলো সবসময় কান্না আর অনুতপ্ততা বাড়ায়। আমাদের আশপাশে এমন অনেক বিকলাঙ্গ মানুষ বা গরীব দিনমজুর রয়েছেন। যারা শত প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও খুশি মনে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। অথচ প্রতিনিয়ত অনেক মানুষই তুচ্ছ কারণেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। শনিবার (১৯ মার্চ) দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ দিন সারা দেশে প্রায় ৬ জন বিভিন্নভাবে আত্মহত্যা করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর জরিপ বলছে বাংলাদেশে বছরে আত্মহত্যা করছেন প্রায় ১৩ হাজার মানুষ৷ গড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ৩৫ জন৷
এদিকে ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত করোনাকালে একটি জরিপ করে আঁচল ফাউন্ডেশন। তাতে দেখা গেছে, ওই সময় দেশে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। তারা এই তথ্যগুলো নিয়েছে তিনটি জাতীয় দৈনিক, পুলিশ ও হাসপাতাল থেকে।
জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে তারা বলেছে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে সম্পর্কজনিত কারণে। আর্থিক কারণে আত্মহত্যার পরিমাণ ৪ শতাংশ। ১ শতাংশ আত্মহত্যা ঘটে লেখাপড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণে। এবং সর্বশেষ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করে ৩২ শতাংশ।
ওই জরিপে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা, যা মোট আত্মহত্যার ৪৯ শতাংশ। এর পরই বেশি আত্মহত্যা করেছে পাঁচ থেকে ১৯ বছর বয়সীরা, যা ৩৫ শতাংশ। ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ছিল ১১ শতাংশ। আর ৫ শতাংশের বয়স ছিল ৪৬ থেকে ৮০ বছর।
সংস্থাটি আরও জানায়, গত বছর ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে প্রেম জনিত কারণ, অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক চাপের কারণে।
জরিপ মতে, বিশ্বের পুরুষ আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা বেশি হলেও বাংলাদেশে নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে। নারী ৫৭ শতাংশ, পুরুষ ৪৩ শতাংশ। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, মূলত মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা থেকেই বেড়ে চলেছে আত্মহত্যার প্রবণতা। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
আত্মহত্যা ধরণও বদলেছে বদলেছে। আত্মঘাতী হওয়ার আগে কেউ যাচ্ছেন ফেসবুক লাইভে আবার কেউবা চিরকুটে নিজের হতাশা-দুর্দশার কথা লিখে রেখে করছেন আত্মহত্যা।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী জানান, আত্মহত্যা করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। ব্যক্তিবিশেষে ক্ষেত্রগুলো ভিন্ন হয়ে থাকে। নিজের স্বার্থে আঘাত লাগা, চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির ব্যবধান, অসহায়ত্ব, কর্মহীনতা, নৈতিক মূল্যবোধ একেবারে ফুরিয়ে যাওয়া, অর্থসংকট ও চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে না নিতে পারাসহ বেশ কয়েকটি কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে করোনার ঘরবন্দি সময়ে মানসিক অস্থিরতা এর জন্য অন্যতম দায়ী।
তিনি বলেন, করোনার সময়ে যেভাবে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে গেছে তা সত্যিই শঙ্কিত করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। পরিবারে জ্যেষ্ঠদের খেয়াল রাখতে হবে, তাদের ছেলে-মেয়ে কী করছে, কাদের সঙ্গে মিশছে। না হলে যে কেউ ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। কারণ আত্মহত্যা করার পেছনে পরিবার, সমাজ ও দেশেরও দায় রয়েছে। মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, তা নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা হওয়া দরকার।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেঘলা সরকার বলেন, এ ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে, তবে পরিবারকেও নিজেদের আচরণ এবং প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। পরিবারের ছোটদের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক বাড়াতে হবে, তাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানদের খেলাধুলা করা এবং সামাজিক মেলামেশা করার সুযোগ বাড়িয়ে দিতে হবে। সন্তানকে চাপ মোকাবেলা করতে শেখাতে হবে, পড়াশোনা বা খেলাধুলা নিয়ে সন্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ না করা। ব্যর্থতা মেনে নেয়া নিজেরাও শিখতে হবে, বাচ্চাকেও শেখাতে হবে। ব্যর্থতা জীবনের অংশ এটা বুঝতে হবে। তিরস্কার করা বা তাদের মর্যাদাহানিকর কিছু না বলা, মনে আঘাত দিয়ে বা সবসময় সমালোচনা না করা, সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করা। আত্মীয়, বন্ধু এবং আশেপাশের পরিবারসমূহকেও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
.jpg)
.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)