এক্সক্লুসিভ
গ্রেপ্তার তরুণদের মুখে হাসি, দেখাচ্ছে জয় চিহ্ন! কেন?
মাসুদ সুমন:
রাত ১১টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় আসাদগেট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান চৌধুরী। ফুটওভার ব্রিজের নিচে আসতেই হঠাৎ করে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে পাঁচ-ছয়জন ছিনতাইকারী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার পেটের কাছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ধরে। দুইজন পকেটে হাত দিয়ে নিয়ে নেয় দুইটি স্মার্টফোন ও নগদ সাত হাজার টাকা। তারপর মুহূর্তেই আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তারা। রাজধানীর সুনসান রাস্তায় এভাবেই ওৎ পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। সুযোগ পেলে ছিনিয়ে নেয় পথচারীদের সবকিছু। অনেকটা টার্গেট করেই এ ধরনের ছিনতাই করে চক্রগুলো।
এ ধরণের কয়েকটি ঘটনার তদন্তে নেমে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাই চক্রের ২৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
গত বুধবার (৬ এপ্রিল) ও শুক্রবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর ও শাহবাগ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত লোহার রড, দা, ছোরা, চাকু, চেতনানাশক ট্যাবলেট ও মলম।
তবে এরা ডিবির কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমে ছবি দেয়ার সময় যে আচরণ করছিল তা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। এ সময় অকারণে হাসছিল তারা। দেখে মনে হচ্ছিল তারা বেশ আনন্দদায়ক সময় পার করছেন। তাদের মাঝে সামান্যতম লজ্জাবোধও ছিল না। তাদের এই আচরণ কৌতূহল ও বিস্ময় তৈরি করেছে। ভাবিয়ে তুলেছে দেশের বিশিষ্টজনদের। তাহলে আমাদের তরুণ সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে? আমাদের হাজার বছরের লালন করা সংস্কৃতি কোন দিকে যাচ্ছে? যাদের হাতে দেশ চলার কথা তাদের আজ এই অবস্থা কেন। প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মনেও।
সমাজের অসঙ্গতি দূর করে, সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত করে যাদের মাধ্যমে ঊষার আলো আসার কথা ছিল তাদের হাতে মাদক, ছিনতাই করার অস্ত্র। তারাই আজ ছুটছে লাগামহীন ঘোড়ার মত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কুপ্রভাবে যেভাবে আমাদের তারুণ্য শক্তি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
অপরাধীদের জন্য আতঙ্কের আরেক নাম ডিবি, ঠিক তাদের হাতে আটক হওয়া এবং তাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় অপরাধীদের এমন আচরণ কি প্রমাণ করছে? তাহলে কি আমরা ক্রমেই এক নিষ্ঠুর সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে মানবিকতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দয়া, মমতা এসব শব্দের কোনো অস্তিত্বই নেই, তার জায়গা দখল করে নিয়েছে অনৈতিকতা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, জিঘাংসা, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা এ জাতীয় সব নেতিবাচক শব্দের কালো হাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব দূরবীন নিউজকে বলেন, অপরাধীদের এমন উদ্ধত আচরণ মূলত আমাদের আইনের ব্যবহারের অপারগতাকেই প্রকাশ করছে। এই অপরাধীরা ভালো করেই জানেন এই অপরাধে তাদের বেশিদিন জেলে থাকতে হবে না। বড় ধরণের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। ফলে পুলিশের কাস্টডিতে থাকা অবস্থাতেও এমন হাসতে পারছে তারা।
তিনি আরও বলেন, এসব অপরাধীর অনেকেই অপরাধ করে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধ করছেন। ফলে নতুন করে আরও অপরাধে জড়িয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তাছাড়া এত কম বয়সে অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য পারিবারিক দায়িত্বের অবহেলাকেও দায়ি করেন তিনি। বলেন, পরিবার থেকে তাদের সঠিক শিক্ষা দেয়া হলে এত অধঃপতনে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এই অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে পারিবারিক বন্ধন জোরদার করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। সেই সাথে প্রতিটি পরিবারকে হতে হবে আরও সোচ্চার।
নাজমুস সাকিব দূরবীন নিউজকে আরও বলেন, অপরাধ ঘটানোর পর দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আইন প্রয়োগ এবং বিচারে কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে অপরাধীর মধ্যে ভীতির সঞ্চার করা কঠিন। অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে, তা আইনের শাসনের জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ছোট অপরাধ করে পার পেয়ে গিয়ে অপরাধীরা বড় অপরাধে উৎসাহী হয়ে উঠে। নানা ফাঁক-ফোকর গলিয়ে অপরাধীরা আইনি গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ডিবি হেফাজতে থাকায় অবস্থাতেও আইনের শাসনের প্রতি এমন অনাস্থা দেখাতে পারে একজন অপরাধী।
তিনি বলেন, মূলত বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা সমাজে অপরাধ বাড়ায়। অপরাধীরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর দুঃসাহস পায়। মানুষ শাস্তির ভয় না পেলে সমাজ বা দেশ থেকে অপরাধ দমন করা কঠিন।
এ বিষয়ে দূরবীন নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর মো. ফরিদ উদ্দিন খান। তার মতে, দেশের বেকার সমস্যা সমাধান হলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের অপরাধে জড়াতে সহযোগিতা করছে। এছাড়াও একজন অপরাধী ভালো করেই জানে একটা সময় তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে। ফলে যখন অপরাধী আটক হচ্ছে, তখন সে হাসছে। অপরাধীর জন্য আইনকে আরও কঠোর হতে হবে এবং সন্তানের সুশিক্ষায় পরিবারকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। দূর করতে হবে দেশের বেকার সমস্যা।
উল্লেখ্য, গ্রেপ্তার হওয়া তরুণদের মুখে হাসি এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২৯ মে ২০২১ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এলএসডিসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও থানা পুলিশ। তারাও পুলিশের কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় একই আচরণ করেছিল।
.jpg)
.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)