

প্রাচীন ঐতিহ্য, নীল জলরাশি আর সবুজ অরণ্যে আচ্ছন্ন ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড সুপরিচিত নারী স্বাধীনতার জন্য। পোল্যান্ডের সামাজিক কাঠামোতে নারীদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়। এদেশের নারীরা বিয়ে বা সংসার করার ব্যাপারে একেবারেই উৎসাহী নয়। বরং তারা একাকী জীবনযাপন করতেই বেশী পছন্দ করেন। পরিবারও এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারেনা। আর বিয়ে করলেও অধিকাংশ বিয়েই বেশিদিন টেকে না, বিবাহ বিচ্ছেদের হার এখানে তুলনামূলক বেশী। আরও অবাক করা বিষয় হল, বেশিরভাগ পোলিশ মেয়েরাই ছেলেদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। তাই বিয়ে ছাড়াও পোলিশ তরুণীদের জীবনে ছেলে বন্ধু বা বয়ফ্রেন্ডের বিশেষ স্থান নেই। এজন্য দেশটিতে কুমারী নারীদের সংখ্যা অনেক বেশী। তাই পোল্যান্ডকে বলা হয় সিঙ্গেল মেয়েদের দেশ। আর রাজধানী ওয়ারশকে বলা হয় নারীদের শহর। কারণ এখানে নারীর আধিপত্য পুরুষের থেকে বেশী। পোলিশ নারীরা পরিবার গঠনে আগ্রহী না হওয়ায় কেউ কেউ দেরিতে বিয়ে করলেও সন্তান গ্রহণ করতে চায় না। এখানে প্রায় ৪০ শতাংশ নারীর সন্তান নেই। পোল্যান্ডের জনগণ, বিশেষ করে মেয়েরা ভীষণ ফ্যাশান সচেতন হয়। পোশাক-আশাকে ফ্যাশান বজায় রাখাটা তাদের জাতীয় পরিচয় বহন করে। এর জন্য তারা নিজের স্বাস্থ্যের বিশেষ যত্ন নেয়। অধিকাংশ মেয়েই শরীর ঠিক রাখতে রোজ জিমে গিয়ে ব্যায়াম করে। রোজ ৫ কিমি হাঁটাহাঁটি করে থাকে। পোল্যান্ডের কিছু অদ্ভুত রীতিনীতি রয়েছে। এদেশের রাস্তায় সব সময় ডানদিক দিয়ে হাঁটা হয়। বামদিক দিয়ে হাঁটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাস্তায় হাঁটার সময় মাথায় হ্যাট পরে ঘোরা পোলিশদের কাছে অসম্মানজনক। জন্মদিন পাশ্চাত্য দেশগুলোতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। কিন্তু পোল্যানন্ডে জন্মদিনের পরিবর্তে শিশুর নামকরণ দিবস পালিত হয়। এদেশের কারও সন্তান জন্মগ্রহণ করলে পরিবার তার নাম রাখতে পারে না, সরকার শিশুটির নাম ঠিক করে দেয়।রাজধানী ওয়ারশতে যানবাহনে থাকাকালীন যদি কোন মা সন্তান জন্ম দেন, তাহলে শিশুটি সারা জীবন দেশটির যেকোন জায়গায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারবে। এদেশে কোনো দম্পতি যদি ২য় সন্তান গ্রহণ করে তাহলে সরকার তার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন। সারা বিশ্বে ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু পোল্যান্ড একমাত্র দেশ যারা ভালবাসা দিবস পালন করে ২১ জুন। বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য তারা একটি আজব উৎসবের আয়োজন করে। বিবাহ যোগ্য যুবকরা সেখানে বালতিতে থাকা পানি তাদের পছন্দের যুবতীদের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। এটি ছেলেদের দিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব। এর উত্তরে কোন মেয়ে তার পছন্দের ছেলেটিকে যদি একটি লিলি ফুল ছুঁড়ে দেয় তাহলে বোঝা যায় মেয়েটি তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। যেহেতু এদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অনেক বেশী, তাই কেউ যদি ৫০ বছর বিয়ে টিকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে সরকার কর্তৃক তাদের প্রেসিডেন্ট পদক প্রদান করে উচ্চশ্রেণির রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়। সাধারণত সব দেশেই সিনেমা শিল্পে ডাবিং করার কাজটি কয়েকজন মিলে করা হয়, কিন্তু এই দেশে একজনই ডাবিং এর সম্পূর্ণ কাজ করে থাকে। এদেশের আরেক নাম সুপার গ্রিন কান্ট্রি। কারণ ইউরোপের সবচেয়ে পুরনো জঙ্গল এদেশেই অবস্থিত। রয়েছে ২৩ টিরও বেশী ন্যাশনাল পার্ক। পোল্যান্ডে জঙ্গলে গিয়ে মাশরুম তোলা অধিবাসীদের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহ্যবাহী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এদেশেই রয়েছে পৃথিবীর প্রথম ইটের তৈরি দুর্গ। আর এই ঐতিহাসিক দুর্গগুলো নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল ২৩০ বছর! পজনান শহরের ওল্ড টাউন স্কোয়ার পর্যটকদের আকর্ষণের একটি অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এখানে বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে ছাগলের স্থাপত্য। এই কারণে পজনান শহরকে বলা হয় দ্য সিটি অব হেড বাটিং গোটস।পোল্যান্ডের ওয়াওয়েল পাহাড়ের পাদদেশের ক্র্যাকো স্থানটি একসময় একটি গ্রাম ছিল, কালক্রমে এটি এতটাই উন্নত হয়ে ওঠে যে, ক্র্যাকোকে এখন বলা হয় ধনীদের শহর। জনসংখ্যা কম হওয়ায় পোল্যান্ডে ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত করানো নিষিদ্ধ। দেশটিতে যেকোন বয়সে মদ্যপান করা বৈধ। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রভাষা পোলিশ। কিন্তু ভাষাটি এতটাই কঠিন যে, অনেক অধিবাসীই ভালমত আয়ত্ত করতে পারে না। পোল্যান্ডের অর্থনীতির ভিত এতটাই মজবুত যে, গোটা ইউরোপের আর্থিক মন্দার সময়ও এই দেশের অবস্থা স্থিতিশীল ছিল।



