একটি শহরের তাপমাত্রা পাঁচ-দশ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নামলেই, নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্থ হয়।
সেই জায়গায় কোনো শহরের তাপমাত্রা যদি, শুন্য ডিগ্রী সেলসিয়াসেরও অনেক নিচে নেমে যায়, তাহলে বাসিন্দাদের কতটা দুর্বিষহ অবস্থা হতে পারে, সেটি অনুমান করা কঠিন নয়।
রাশিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, সাখা রিপাবলিকের রাজধানী ইয়াকুটস্ক তেমনই একটি শহর। সম্প্রতি এখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসেr নেমে এসেছে।
অধিকাংশ সময়ই শহরটির তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে। এত কম তাপমাত্রার জন্য একে পৃথিবীর শীতলতম শহরও বলা হয়ে থাকে।
সূর্যের দেখা পাওয়া এখানে বিরল ঘটনা। দিনরাত্রি মিলিয়ে প্রায় ২১ ঘণ্টাই অন্ধকারে আবৃত থাকে ইয়াকুটস্ক। প্রতিনিয়ত তুষারপাত আর শীতের প্রকোপ জয় করে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন বাসিন্দারা।
বাইরে বের হলে তাদের চোখের পাপড়ি, এমনকি দাড়িও জমে যায় বরফে। সানগ্লাস বা চশমা পরলে সেটি বরফে ঢেকে যায়। পরে চশমা খোলা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ইয়াকুটস্কের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদীগুলো শীতের সময় সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢাকা থাকে। এগুলোকে তখন তারা হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করেন।
তীব্র শীতেও ইয়াকুটস্ক শহরে থেমে থাকে না জীবন। কয়েক স্তরের পোশাক পরে বাজারে বেচাকেনা করেন স্থানীয়রা। সকালে খোলা বাজারে যে মাছ মাংস নিয়ে আসা হয়, সেটি কিছু সময়ের মধ্যেই জমে ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে যায়।
এই অঞ্চলে বসবাসকারীরা, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাংস, মাছ ও বেরি জাতীয় খাবারের উপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে। স্থানীয়দের মাঝে ইন্ডিগিরকা নামক একটি খাবারের চল রয়েছে।
মাছের সাথে পেঁয়াজ, লবণ, মরিচ ও উদ্ভিজ্জ তেল মিশিয়ে এ খাবার তৈরি করা হয়। এছাড়া
বল্গাহরিণের মাংসও বেশ জনপ্রিয় তাদের কাছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ইয়াকুটস্ক। শহরটি নিয়ে একটি প্রচলিত কল্প কাহিনী রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
তারা মনে করেন, ধর্মীয় দেবতা সারা পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদ বন্টন করার সময় এই এলাকায় এসে শীতে জমে গিয়েছিলেন। ফলে তার হাতে থাকা অবশিষ্ট সকল সম্পদ এখানে পড়ে যায়।
দুটি বৃহদাকার বিমানবন্দর আছে এখানে। তবে শীতের মাস গুলোতে বিমান চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি দূর্ঘটনা এড়াতে বছরের বেশিরভাগ সময়েই বিমান চলাচল বন্ধ থাকে।
এখানকার উল্লেখযোগ্য একটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে ম্যামথের জাদুঘর। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া বিলুপ্ত প্রাণী ম্যামথের দাঁত, হাড় ও কঙ্কালের দুর্দান্ত প্রদর্শনী রয়েছে এ জাদুঘরে।
পারমাফ্রস্ট কিংডম নামে একটি ভূ-গর্ভস্থ জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে কয়েক ডজন বরফের ভাস্কর্য সংরক্ষিত আছে, যা কখনোই গলে না।
বিশ্বের এই শীতলতম শহরের মানুষেরা বিনোদনের জন্য ফিল্ম, থিয়েটার ও বিভিন্ন রকম উৎসবের ব্যবস্থা করে থাকেন।
বর্তমানে ইয়াকুটস্ক সমগ্র রাশিয়ার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, 'বরফের নরক' হিসেবে খ্যাত শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার।
বাসিন্দাদের অধিকাংশই খনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
রাশিয়ার দ্রুত উন্নয়নশীল আঞ্চলিক শহরগুলির মধ্যে অন্যতম ইয়াকুটস্ক।
এখান থেকে প্রায় ৯২৮ কিলোমিটার দূরে আরেকটি গ্রাম অইমিয়াকন। সেখানেও শীতের সময়ে মাইনাস ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে।
অনেকে একে শীতল মেরু হিসেবেও চেনেন। শীতের সময়গুলোতে প্রায় ২১ ঘণ্টাই অন্ধকারে আবৃত থাকে অয়মিয়াকন। এই সময়ে আশপাশের নদনদী বরফে ঢাকা থাকে।