কৃত্রিম সূর্য কিংবা মহাকাশে নিজেদের স্টেশন! কোন দিকে এগিয়ে নেই চীন! একের পর এক রেকর্ড করেই চলেছে দেশটি! পৃথিবীর বৃহত্তম রেডিও স্টেশন বানানোর রেকর্ডও বেইজিং এর!
এই টেলিস্কোপের অবস্থান চীনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি পাহাড়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়।
টেলিস্কোপটির সংক্ষিপ্ত নাম 'ফাস্ট' বা 'ফাইভ হান্ড্রেড মিটার এপারচার স্ফ্যারিকাল রেডিও টেলিস্কোপ"।
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এই টেলিস্কোপটি ব্যাস ৫০০ মিটার বা ১৬০০ ফুট। টেলিস্কোপটিতে রয়েছে ৪ হাজার অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল যা মহাকাশ থেকে আগত রেডিও তরঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরতে পারে।
চীনা ভাষায় এই টেলিস্কোপকে 'তিয়ানইয়ান' নামে ডাকা হয় যার বাংলা অর্থ 'স্বর্গের চোখ'। উপর থেকে দেখলে মনে হবে বিরাট বড় একটি চোখ সটান আকাশের দিকে চেয়ে আছে।
যদিও ফাস্ট টেলিস্কোপ তৈরী করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় আজ থেকে ২৯ বছর আগে, ১৯৯৪ সালে। তবে এটি নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে এবং শেষ হয় ২০১৬ তে।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম একটি প্রাকৃতিক গোলাকার উপত্যকা, ডাওয়াডাং ডিপ্রেশনে বসানো হয়েছে এই টেলিস্কোপ! অর্ধ কিলোমিটার ব্যাসের এই টেলিস্কোপের জন্য বিরাটাকার প্রাকৃতিক বেসিনটি খুঁজে পেতে সময় লেগেছে প্রায় বারো বছর।
কমপক্ষে ১ হাজারটি স্থান থেকে বেছে নেয়া হয়েছে এই স্থানটিকে। এখানে টেলিস্কোপ বসাতে চীনা সরকারের খরচ হয়েছে ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই টেলিস্কোপ নির্মাণের পেছনে রয়েছেন চীনের সর্বকালের সেরা অ্যাস্ট্রোনমার নান রেংডন। ৯০ এর দশকে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এরিসিবো টেলিস্কোপের মতো চীনেরও থাকবে বিরাট এবং নিজস্ব একটি টেলিস্কোপ।
তার এই স্বপ্নের বাস্তবরুপ আজকের এই ফাস্ট টেলিস্কোপ।
এখন খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। এতো বছর সময় নিয়ে যে টেলিস্কোপটি নির্মিত হলো, এই টেলিস্কোপ নির্মাণের পেছনে চীনের উদ্দ্যেশ্য কী ছিল? এবং এই কয়েক বছরে এই টেলিস্কোপ থেকে কী পেয়েছে বিশ্ব?
সারা বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্র বর্তমানে মহাকাশ গবেষণায় ইতিহাস সৃষ্টি করে চলেছে। শুধু গবেষণা নয়, মহাকাশে পর্যটনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিযোগিতা। মহাকাশকেন্দ্রিক এই কঠিন প্রতিযোগীতায় ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে চীন।
এই দৌঁড়ে রাশিয়া এবং আমেরিকার সাথে টেক্কা দিতেই চীনারা এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে যার মাধ্যমে একদিন মহাকাশের অনাবিষ্কৃত দিক উন্মোচিত হবে।
২০১৭ সালে টেলিস্কোপটির সাহায্যে নতুন নতুন কিছু পালসার বা নিউট্রন নক্ষত্র আবিষ্কৃত হয়। এখনো অবধি এই টেলিস্কোপের আবিষ্কৃত এরুপ নক্ষত্রের সংখ্যা ৬৬০ টি।
অনেকগুলো শক্তিশালী কম্পিউটারের এক একটি ক্লাস্টার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মহাজাগতিক স্যাম্পল গ্রহণ করে যা সরবরাহ করে থাকে এই দানবাকার রেডিও টেলিস্কোপটি।
এইসব স্যাম্পলের সাহায্যে তৈরী করা হয়েছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মহাজাগতিক সিগনাল বা বার্তা। অনেক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন এসব সিগনালের কোনো কোনোটা বুদ্ধিমান ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনের পাঠানো হতে পারে।
রেডিও টেলিস্কোপের আরেকটি অনবদ্য আবিষ্কার 'ফাস্ট রেডিও বার্স্ট' বা 'এফআরবি'। এটিকে বলা হয় মহাবিশ্বের অদ্ভুত এক রহস্য। মহাকাশের গভীরতর স্থান থেকে আগত এই বার্স্টগুলো উৎপত্তির পর ঠিক এক মিলিসেকেন্ডের মাঝেই মিলিয়ে যায়। সব থেকে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এইটুকু সময়ে তারা যে শক্তি উৎপন্ন করে সেই একই শক্তি সূর্যের উৎপন্ন করতে লেগে যাবে পুরো এক বছর। কিন্তু এরা এতো দ্রুতগতিতে মিলিয়ে যায় যে, এদের ধরতে পারা কঠিন।
ফাস্ট রেডিও টেলিস্কোপ এখনো অবধি ১৮৬৩ টি ফাস্ট বার্স্ট ৮২ ঘন্টার মধ্যে ধরতে সক্ষম হয়েছে।