আন্তর্জাতিক


দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়লার ব্যবহার কমলেও বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:১৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার

দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়লার ব্যবহার কমলেও বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
দক্ষিণ কোরিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক কম নির্ভর করছে কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)–এর ওপর। পরিবর্তে, দেশটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির ওপর জোর দিচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ছাড়িয়ে, দ্রুতগতিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েই চলেছে, যার ফলে উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি কেপকোর (Kepco) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বেড়েছে। অথচ সরকার বার্ষিক মাত্র ২.৯ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। বিপরীতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১৬ শতাংশ।
কোরিয়া পাওয়ার এক্সচেঞ্জ (KPX) জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূলনীতি হলো সর্বনিম্ন খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ব্যয়, কয়লা বা এলএনজির তুলনায় সাধারণত কম হয়। সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যতে পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য শক্তির পরিসর বাড়লে কয়লা ও গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে যাবে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধ ২৯ শতাংশ কমে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬ শতাংশ বাড়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব সিউলে অবস্থিত ১.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার শিন হানুল-২ পারমাণবিক কেন্দ্র ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে চালু হয়েছে।
চীনের পর দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ। প্রযুক্তিগত বাধা ও নীতিগত আপত্তি কমে আসায় দেশটি পারমাণবিক খাত সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছে। জাপানও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করছে এবং ভারত নতুন রিঅ্যাক্টর চালু করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে চালু রয়েছে ২৬টি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, যেগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ২৬.০৫ গিগাওয়াট। নির্মাণাধীন চারটি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে দুটি ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্ত হবে, যাদের সম্মিলিত ক্ষমতা হবে ২.৮ গিগাওয়াট।
২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর নিরাপত্তা পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কোরিয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কমে গিয়েছিল। তখন কয়লা ও এলএনজির ব্যবহার বেড়ে যায়। তবে ২০২২ সাল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং পারমাণবিক উৎপাদন গড়ে প্রতি বছর ৬.১ শতাংশ হারে বাড়ছে।
২০২৪ সালের জুনে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং পারমাণবিক খাতে সরকারের পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেপকোর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির অংশ ছিল ২৫.৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.৭ শতাংশে। একই সময়ে কয়লার অংশ কমেছে ৪০.৪ শতাংশ থেকে ২৮.১ শতাংশে।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও কমেছে। ২০২২ সালের পর থেকে কয়লার আমদানি গড়ে বছরে ৮ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে এবং ২০২৪ সালে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫.৪ বিলিয়ন ডলারে, যা পূর্বের তুলনায় ২৩ শতাংশ কম।
সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে অনেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে অংশ নিতে পারছে না, কারণ সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতা সীমিত।
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সিউংহুন ইউ বলেন, ‘অনেক কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, বরং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বহনের সক্ষমতা না থাকায় বন্ধ হয়ে আছে।’
একই কারণে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস জানায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও জলবিদ্যুৎ মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ আসে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ।
২০২২ সাল থেকে কুলিং বা শীতলীকরণ ব্যবহারের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, যদিও শিল্পখাতে চাহিদা কিছুটা কমেছে। চাহিদা ধীরগতিতে বাড়ায় গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সারাদিন চালানোর প্রয়োজন নেই। এসব কেন্দ্র এখন সকাল ও সন্ধ্যার চাহিদা-পিক সময়ে চালু হয় এবং দুপুরে বন্ধ থাকে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়লেও তা এখনো দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলেনি।

সম্পর্কিত

আন্তর্জাতিক

জনপ্রিয়


আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন

৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ- কোন দেশে কত নিহত, বাংলাদেশির সংখ্যা কত?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। শুধু ইসরায়েল নয়, ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক বিজয় হয়েছে: ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান-এর সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক বিজয়’ অর্জন করেছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ‘ইরানের বিজয়’

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উত্থাপিত ১০ দফা দাবি মেনে নিয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্র ‘রেড লাইন’ পার হলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে: ইরান

যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরানের নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে, তাহলে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমন কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।