

ভারতের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে এখনও ছুটে চলছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো রেল ইঞ্জিন। ১৬৭ বছর বয়সী ইঞ্জিনটি ভারতীয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাত্রা শুরু করেছিল ব্রিটিশ আমলে। বিশ্বের প্রাচীনতম সক্রিয় এই রেল ইঞ্জিনটি মূলত একটি স্টিম ইঞ্জিন, যার নাম রাখা হয়েছিল ইআইআর - ২১। সম্প্রতি ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে চেন্নাইয়ের এগমোর স্টেশন থেকে কোদামবাক্কাম স্টেশন পর্যন্ত চালানো হয়েছে ইঞ্জিন বগিটি। ছুটে চলার পূর্বে ১০১ বছর ধরে বিশ্রামে থাকা স্টিম ইঞ্জিনের গতি নিয়ে অনেকেই শঙ্কায় ছিল। এত দিনের পুরনো ইঞ্জিন হয়তো তেমন ছুটতে পারবে না, এমন ধারণা পোষণ করাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সমস্ত শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে ঘন্টায় ৪৫ কি মি গতিবেগে ভারতের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ছুটে চলেছে ইআইআর - ২১। তাছাড়া, এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে বাড়তি দুটি এয়ার ব্রেক এবং একটি মেকানিকাল হ্যান্ড ব্রেক। ব্রিটিশ যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে চলমান ট্রেনগুলো আজকের দিনের মতো এত উন্নত মানের ছিল না। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে রেল ব্যবস্থায়ও। কয়লার বাষ্পীয় ইঞ্জিনের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে আধুনিক যন্ত্রচালিত ইঞ্জিন। ফলে আগের যুগের রেল লাইন কিংবা স্টিম ইঞ্জিনগুলো এখন আর কার্যকরী নেই বললেই চলে। শতাব্দী প্রাচীন ট্রেনগুলোকেও আর সেবা দিতে দেখা যায় না তাই। কিন্তু ভারতীয় রেলের গর্বের সম্পদ এই ইআইআর - ২১ ইঞ্জিনটির সাথে জড়িয়ে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্য। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে এটি তৈরি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডেই। তারপর ১৮৫৫ সালে জাহাজে করে ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। তখন থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত একটানা ৫৪ বছর ভারতীয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিয়মিত চলাচল করেছে এটি। এর প্রথম যাত্রা ছিল কলকাতা থেকে দিল্লী পর্যন্ত। ১৮৬৬ সালে কলকাতার বিখ্যাত হাওড়া রেলস্টেশন থেকে দিল্লি রেল স্টেশন অবধি ট্রেন পরিষেবা পরিচালিত হয়েছিল এই ইঞ্জিন দিয়েই। কলকাতা-দিল্লী রুট ছাড়াও, হাওড়া স্টেশন থেকে পশ্চিমবঙ্গের রানিগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জায়গাতেও চলাচল করত ইআইআর-২১। সেইসময় ভারতে এমন স্টিম ইঞ্জিনচালিত রেল ব্যবহার করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ইংলিশ অ্যান্ড ব্রিটিশ কোম্পানির সাহেব ও কর্মচারীরা। ১৯০৯ সালে অবসর দেয়া হয় ইঞ্জিনটিকে। ঐতিহ্য হিসেবে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয় সংগ্রহশালায়। সেই থেকে দীর্ঘ ১০১ বছর ধরে বিহারের জামালপুর ওয়ার্কশপই ছিল ইআইআর - ২১ এর ঠিকানা। পরবর্তীতে, ২০১০ সালে তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের নিকটবর্তী পেরাম্বুরের রেল ওয়ার্কশপে স্থানান্তর করা হয় এটি। দীর্ঘ দিন বিশ্রামে থাকায় একে সক্রিয় করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় ভারতীয় রেলের তরফ থেকে।সাজিয়ে তোলা হয় নতুনের মতো করে। এরপর সেই বছরই ভারতের স্বাধীনতা দিবসে পুনর্জন্ম হয় স্টিম ইঞ্জিনটির। চেন্নাই সেন্ট্রাল রেলস্টেশন থেকে অভদি রেলস্টেশন পর্যন্ত চালানো হয় এটি। ঐতিহাসিক সেই যাত্রার নাম দেয়া হয়েছিল দ্য হেরিটেজ রান। একইভাবে সচল রাখার জন্য ২০১৯ সালেও একটি বগি সংযুক্ত করে ট্র্যাকে নামানো হয় শতাব্দী প্রাচীন ইঞ্জিনটিকে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ ই আগস্ট একটি কোচ দ্বারা সংযুক্ত হয়ে ১৬৭ বছর বয়সেও গতি ও সক্রিয়তার এক অনন্য নজির স্থাপন করল স্টিম ইঞ্জিন ইআইআর - ২১। এটি তাই শুধু ভারতের নয়, সারা বিশ্বের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।



