পৃথিবীর বড় বড় অনেক সেতুই বাঁকা করে বানানো হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা পদ্মা সেতুর আকৃতি ও অনেকটাই বাঁকানো।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এসব বড় বড় সেতু সোজা না বানিয়ে বাঁকা করে বানানো হয় কেন।
শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এভাবে বাঁকা করে বানানো হয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোন উদ্দেশ্য।
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ব্রিজ চীনের হংকং ম্যাকাও সেতু। এটিও বাঁকা করে বানানো হয়েছে সাগরের উপর দিয়ে।
অথচ সোজা আকৃতিতে বানালে হয়তো এর দৈর্ঘ্য কিছুটা কম হতো। তাতে খরচ ও কমতে পারতো অনেকটাই।
তবে এর পিছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কয়েকটি বিশেষ কারণে বড় বড় এসব সেতু বানানো হয়ে থাকে কিছুটা বাঁকা আকৃতিতে।
সাধারণত পৃথিবীর যেকোন সেতুকে বহন করতে হয় তিন ধরণের ওজন। এর প্রথমটি হচ্ছে ব্রিজের নিজস্ব কাঠামোর।
সেতু বানানো হয় কংক্রিট স্টীল ও সিমেন্টের মতো ভারি ভারি উপাদান দিয়ে। পিলারগুলোকেই বহন করতে হয় সমস্ত ভার।
দ্বিতীয় ওজন হচ্ছে সেতুর উপর দিয়ে চলাচল কারী যানবাহনের। সাধারণত বড় সব সেতুর উপর দিয়ে বাস ট্রাক এমনকি বড় বড় ট্রেন ও চলাচল করে থাকে।
এসব যানবাহনের ওজন হয় কয়েক টন পর্যন্ত। এছাড়াও আরেক ধরণের ওজন বা চাপ পড়ে সেতুর উপর।
যা সৃষ্টি হয় নদী বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে। যেকোন বড় সেতুর ডিজাইন করার সময় এসব ওজনের ব্যাপার মাথায় রাখতে হয় ইঞ্জিনিয়ারদের।
কোন সেতুর উপর যখন গাড়ি উঠে, তখন কম্পনজনিত এক ধরণের চাপ সৃষ্টি হয় সেতুর উপর।
সেতু বাঁকা করে বানানো হলে এই চাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সেতুতে।
এর মাধ্যমে যানবাহনের লোডগুলো আরোপিত হয় সেতুর প্রতিটি পিলারের উপর। ফলে নির্দিষ্ট কোন অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।
কিন্তু সেতুর ডিজাইন সোজা আকৃতির হলে, যানবাহনের এসব লোড পুরো সেতুতে ছড়ায় না। ফলে কোন অংশে বেশি চাপ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশংকা থেকে যায়।
যানবাহনের এই চাপ ছাড়াও বড় বড় সেতুর পিলার গুলোকে লড়তে হয় নদীর প্রচণ্ড স্রোতের বিপক্ষে।
স্রোতের সময় প্রচণ্ড চাপ পড়ে সেতুর পিলার গুলোর উপর। কিন্তু বাঁকা আকৃতিতে সেতু বানানো হলে স্রোতের এই চাপ হয়ে থাকে কিছুটা কম।
এছাড়া বড় বড় সেতু বানানোর সময় ভূমিকম্পের কথাও মাথায় রাখতে হয় ইঞ্জিনিয়ারদের।
বাঁকা আকৃতিতে বানানো হলে ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ধরে রাখতে পারে সেতুর পিলারগুলো।
এসব কারণে বড় বড় সেতু বাঁকা করে বানানোর এই কৌশল অবলম্বন করেন ইঞ্জিনিয়াররা। তবে এগুলো ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ।
এক টানা দীর্ঘ সময় সোজা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে অনেক সময় ক্লান্তি অনুভব করেন চালকরা। এমনকি এমন সোজা রাস্তায় ঘুমিয়েও পড়তে পারেন তারা।
এর ফলে যেকোন সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। বড় বড় সেতুর আকৃতি বাঁকা হলে এই আশংকা অনেকটাই কমে যায়।
এছাড়া বিভিন্ন সেতুর আকৃতি সাধারণত দেখা যায় অনেকটা ধনুকের মতো মাঝখানে বাঁকানো। এটি করা হয়ে থাকে সেতুর মোমেন্টাম ঠিক রাখার জন্য।
এর ফলে বন্যার সময় যখন পানির অত্যধিক চাপ থাকে, তখনো সেতুর কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয় পিলারগুলো।
এসব ক্ষেত্রে রড সিমেন্ট বেশি প্রয়োজন হয়, এমনকি খরচ ও বেড়ে যায় অনেকগুন।
তবে নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের কথা বিবেচনা করে এভাবে সেতু ডিজাইন করে থাকেন ইঞ্জিনিয়াররা।