

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে জনপ্রিয় সমুদ্রপথ সুয়েজখালের বিকল্প হয়ে উঠতে যাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন বেরিং প্রণালী। উত্তর মেরুর নিকটবর্তী আর্কটিক অঞ্চলে অত্যধিক হারে বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্র বাণিজ্যে একটি নতুন পথের সূচনা হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৮০% ই সম্পাদিত হয় সমুদ্রপথে। আর সেক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগর আর লোহিত সাগরকে সংযুক্তকারী সুয়েজ খাল দীর্ঘদিন ধরেই একটি অপরিহার্য পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কারণ এপথে তুলনামূলক কম সময়ে এশিয়া আর ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচল করতে পারে। খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে তেল রফতানি করা হয় সুয়েজ খালের মাধ্যমেই। প্রতিদিন এপথ দিয়ে ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।কিন্তু গত বছর ৪০০ মিটার দীর্ঘ এভার গিভেন জাহাজ সুয়েজ খালে আটকা পড়ে যায়। এতে কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। প্রকাশ পায় সুয়েজ খালের দুর্বলতা। একে কেন্দ্র করেই বিকল্প বাণিজ্যিক সমুদ্রপথগুলোর উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিকল্প হিসেবে সেক্ষেত্রে প্রথমেই প্রস্তাব করা হয় উত্তর মহাসাগরের বেরিং প্রণালির নাম। কারণ একসময় প্রচুর পরিমাণে বরফে আবৃত থাকলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই পথটি এখন জাহাজ চলাচলের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে।বিশ্বের ব্যস্ততম বাণিজ্যপথ সুয়েজ খালের সীমাবদ্ধতার কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে একটি শর্টকাট পথ হিসেবে বিকশিত হতে যাচ্ছে বেরিং প্রণালীর নর্দান সি রুট। নতুন পথটি ব্যবহার করা হলে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হবে রাশিয়া। বেরিং প্রণালী প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে উত্তর মহাসাগরের সাথে। ফলে উত্তর মহাসাগরের দক্ষিণে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার জন্য এটি হয়ে উঠবে একটি একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিশেষ করে উত্তর রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে পথটি আদর্শ হয়ে উঠব। এপথে আর্কটিক অঞ্চলের তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস কম সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করতে পারবে। নর্দান সি রুটে জাহাজ চলাচল করলে উত্তর ইউরোপ থেকে চীনের দূরত্ব সুয়েজ খালের তুলনায় ৪০% কমে যায়। একইভাবে এই পথে ইউরোপ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার পৌঁছাতে জাহাজের সময় লাগবে মাত্র ১৯ দিন।আর এই যাত্রায় সুয়েজ খাল ব্যবহারে সময় লাগবে ৩৮ দিন। অর্থাৎ, নতুন পথে কমে যাচ্ছে দ্বিগুণ সময়। আবার দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সুয়েজ খালের তুলনায় এই পথে প্রায় ৪,০০০ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব কমে যাবে। জাপান থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যেতে সময় লাগে ২২ দিন। কিন্তু বেরিং প্রণালি ব্যবহার করলে লাগবে মাত্র ১০ দিন। কারণ সুয়েজখালের তুলয়ায় এপথে প্রায় ১১,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব কম হয়।সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি উত্তর মহাসাগরের বাণিজ্যপথে জ্বালানীর খরচও কমে যাবে ৩০-৪০%। এই পথে জলদস্যুদের আক্রমণের ঝুঁকিও নেই। আরও একটি সুবিধা হলো সংক্ষিপ্ত পথ অতিক্রম করায় জাহাজগুলো থেকে সমুদ্র দূষণও কম হবে। ধারণা করা হচ্ছে এই পথে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন ১.২ মিলিয়ন টন হ্রাস পেতে পারে।আর্কটিক অঞ্চলের বরফ যত গলবে, ততই জাহাজ চলাচলের জন্য উপযুক্ত হবে নর্দান সি রুট। এসব সুবিধার কথা ভেবেই, নরওয়েভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি বেরিং প্রণালির বাণিজ্যপথের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে।সমীক্ষার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এপথে ২০৩০ সাল নাগাদ ৫০০ টি এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ৯০০ টির মত জাহাজ চলাচল শুরু হবে।কানাডা এবং আমেরিকার সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞরাও ধারণা করছেন , ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ উত্তর মহাসাগরের মাধ্যমে হতে পারে। শীতকালে উত্তরাঞ্চল বরফাবৃত থাকায় তখন সামুদ্রিক বাণিজ্যে সুয়েজখালই একমাত্র ভরসা। কিন্তু আর্কটিক অঞ্চল গ্রীষ্মকালে প্রায় বরফমুক্ত থাকে। তাই এসময়ই বিকল্প বাণিজ্যপথ হিসেবে এটি ব্যবহার করাটা একটি ব্যয় সাশ্রয়ী পন্থা। আগামী দিনগুলোতে সমুদ্র বাণিজ্যে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে চলেছে, যা একই সাথে ত্বরান্বিত করবে ভৌগোলিক সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।



