

মরুভূমির দেশ হলেও সৌদি আরবের প্রাকৃতিক পরিবেশ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। একদিকে যেমন রয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ধু ধু বালির প্রান্তর, তেমনি আবার রয়েছে মেঘে ঢাকা, সবুজে ঘেরা পার্বত্য অঞ্চল। দেশটির দক্ষিণে সবুজ পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত এমন একটি শহর রয়েছে, যেখানে আকাশ সবসময়ই ঢাকা থাকে মেঘ আর কুয়াশার আবরণে। স্থানটির নাম আল-নমাস। তবে মনোরম এই শৈলশহরটি স্থানীয়ভাবে কুয়াশার শহর নামে পরিচিত। এটি সৌদির অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এ কারণেই গ্রীষ্মকালে সৌদির অন্যান্য স্থানে যখন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তখন আল নমাসের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির উপরে ওঠে না। আর শীতকালে কুয়াশার শহরের তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের নীচে। মরুভূমির একঘেয়েমি রুক্ষ আবহাওয়ার মধ্যে এমন একটি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় স্থান সৌদিবাসীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাজধানী রিয়াদ থেকে শহরটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৮০০ কিলোমিটার। সড়কপথে গাড়িতে করে পৌঁছাতে সময় লাগে ১২ ঘণ্টার মতো। তবুও পথের ধকল সহ্য করে বহু পর্যটক ঘুরতে যান সেখানে।বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে আগামীতে মরু শহরগুলিতে বসবাস করা দুরূহ হয়ে যাবে। তখন শুধু পর্যটন নয়, মানুষের বসবাসের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আল নমাস। উত্তপ্ত বালিতে ঢাকা সৌদিতে শুধু যে কুয়াশায় মোড়া পাহাড়ি শহর রয়েছে তাই নয়, প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানের তালিকায় পাহাড়ি বনভূমিও রয়েছে।দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে সবুজ জুনিপার গাছে ঢাকা আসির পর্বতমালা। এমনকি গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাতও হয় এই পার্বত্য জঙ্গলে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও কম নেই এখানে। পাহাড়ি জঙ্গলে বাস করে পাঁচ লাখ হামদ্রিয়াজ বেবুন। আরও রয়েছে হর্নবিল, ঈগল আর নীলচে আগামিড গিরগিটি।শুধু তাই নয়, পাহাড়ের ধাপে ধাপে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর ছোট ছোট গ্রাম। এখানে পর্যটকদের পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য কেবল কারের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে সৌদি ঘুরতে আসা অনেক মানুষই এখনও জানেন না এই স্থানটির কথা। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের আরেকটি আকর্ষণীয় স্থান আল হফুফ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরূদ্যান এটি। রয়েছে অসংখ্য খেজুর গাছের সমাহার। খেজুর বাগানের মধ্যে উপভোগ করা যায় সরু ঝরনা ধারার চোখ জুড়ানো দৃশ্য। ধূসর মরুর দেশ সৌদিতে আরও রয়েছে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত আল-কুরা পর্বত। যার ভেতর রয়েছে বিচিত্র এক গিরিগুহা। পাহাড় বেয়ে অদ্ভুত সেই গুহায় ঢুকলে মরুভূমির উত্তাপ একেবারেই অনুভব করা যায় না, নিমেষেই শীতল হয়ে যায় দেহ। সৌদি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত জেদ্দা দেশটির ২য় বৃহত্তম শহর, অর্থনৈতিক রাজধানী এবং প্রধান বন্দর নগরী। এছাড়াও এখানে রয়েছে ব্যস্ততম বিমানবন্দর। মক্কা-মদিনার দরজা হিসেবে খ্যাত এই শহরটি। সৌদির অধিবাসী ছাড়াও অন্যান্য দেশের মানুষ এখানে বসবাস করে। ফলে জেদ্দা একটি আন্তর্জাতিক শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। সেই সাথে হয়ে উঠেছে মিশ্র সংস্কৃতির একটি অনন্য কেন্দ্রস্থল।জেদ্দার রাস্তাঘাটে বা ক্যাফেতে অনেক মিশরীয়দের দেখা যায়। দর্জির দোকানে পোশাক সেলাইয়ের কাজ করে ইয়েমেনের অধিবাসীরা। আবার ফুটপাতে মসলা বিক্রি করতে দেখা যায় জিবুতি, ইরিত্রিয়া এবং সোমালিয়ার নারীদের। বিভিন্ন দেশের মানুষের সহাবস্থানের কারণেই শহরটিতে আরবির পাশাপাশি অন্যান্য ভাষারও বিকাশ ঘটেছে। জেদ্দার শহরের অলিগলিতে আরবির সাথে সাথে শোনা যায় ইথিওপিয়ান ভাষা। এমনকি কানে ভেসে আসে হিন্দি ভাষার শব্দও।জেদ্দা শুধু সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও আধার। এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সমুদ্র সৈকত আর সৈকত সংলগ্ন পৃথিবীর উচ্চতম ঝর্ণা কিংস ফাউন্টেন।



