অশ্বক্ষুরের ন্যায় দেখতে, উপবৃত্তাকার এই প্রানীটির নাম, ‘হর্সসু ক্র্যাব’ বা ‘লিমুলাস’। অনেকের কাছে, এটি রাজ কাঁকড়া নামেও পরিচিত।
স্বাভাবিক ভাবে, বেশিরভাগ প্রানীর রক্তের রং লাল হলেও, লিমুলাসের রক্তের রং হয় নীল।
আর নীল রংয়ের, এই রক্তের রয়েছে, অসাধারণ ক্ষমতা। তাই এই কাঁকড়ার প্রতি লিটার রক্ত বিক্রি হয়, ১১ লাখ টাকায়।
রক্তের অসাধারণ ক্ষমতা থাকায়, অশ্বক্ষুরাকৃতি কাঁকড়ারা, যে কোনও ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ থেকে, নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
এমনকি মানবদেহে প্রয়োগের আগে, এ কাঁকড়ার এক বিন্দু রক্ত দিয়েও পরীক্ষা করে নেয়া যায়, টিকা বা ভ্যাক্সিন, জীবাণু মুক্ত কিনা।
আজ পর্যন্ত ভ্যাক্সিন নিয়ে যত ধরনের গবেষণা হয়েছে এবং যত ধরনের ভ্যাক্সিন উৎপাদিত হয়েছে প্রত্যেকটির জন্যই প্রয়োজন হয়েছে এদের রক্ত।
করোনা মহামারীকে নিয়ন্ত্রন করতে যেসব ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করা হয়েছে সেখানেও ব্যাবহার করা হয়েছে হর্সশু কাঁকড়ার মূল্যবান নীল রক্ত।
চিকিৎসা ও বিভিন্ন গবেষণায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নির্ণয়েও এই প্রাণীটি বহুল ব্যবহৃত।
এভাবে রাজ কাঁকড়ার রক্ত দিয়েই লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। তাই এদেরকে জীবন দানকারী প্রানীও বলা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে হর্সশু কাঁকড়ার ব্যাপক ব্যবহারের কারণেই এদের রক্তের এত দাম!
চাষের কাজে সার হিসেবে এবং মাছ ধরার সময় টোপ হিসেবেও এদের ব্যবহার আছে।
মেরুদন্ডী প্রানীদের রক্তে রঞ্জক পদার্থ হিসেবে হিমোগ্লোবিন উপস্থিত থাকে। কিন্তু লিমুলাসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একেবারেই আলাদা।
এদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিবর্তে হিমোসায়ানিন নামক উপাদান থাকে। সেখানে কপার বা তামার উপস্থিতি বেশি হওয়ায় রক্তের রং হয় নীলচে ধরনের।
১৯৭০ সাল থেকেই বিজ্ঞানীরা নীল কাকড়ার রক্ত সংগ্রহ করে আসছেন। তবে এর জন্য কাকড়াটিকে একেবারে মেরে ফেলা হয় না।
শুরুতে সমুদ্র থেকে ধরে প্রানীটিকে ল্যাবে নিয়ে আসা হয়। তারপর সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে শরীর থেকে ৩০ শতাংশ রক্ত বের করে নেয়া হয়।
হৃদপিন্ডের কাছে থাকা একটি ধমনীর মাধ্যমে বের করে আনা হয় এই মহামূল্যবান তরল পদার্থ।
কাজ শেষে পুনরায় ছেড়ে দেয়া হয় যথাস্থানে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ পদ্ধতিকে বলা হয় মিল্কিং।
তবে পরিবেশবাদীরা অনেক আগে থেকেই এই পদ্ধতির বিরোধিতা করে আসছেন। সেই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদেরকে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য বলছেন।
কারন ৩০ শতাংশ রক্ত বের করে উন্মুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দিলেও প্রানীটির স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়।
রক্ত সংগ্রহের পর ছেড়ে দেয়া কাঁকড়া গুলোর মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ মারা যায়।
যারা বেচে থাকে তাদেরও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই রাজ কাকড়ার ভবিষ্যৎ দিনে দিনে হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।
প্রাপ্তবয়স্ক কাকড়া প্রজননকালে ডিম পাড়ার জন্য সমুদ্র উপকূলে উঠে আসে। এরা বছরে ৬০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার পর্যন্ত ডিম দেয়।
তবে এরমধ্যে খুবই অল্প সংখ্যক ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।
কিন্তু ডিম পেড়ে পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার পথে শিকারিদের হাতে আটকা পড়ে অধিকাংশ মা কাকড়া।
অনেক দেশে এদের দেহ থেকে সম্পূর্ণ রক্তই বের করে নেয়া হয়।
এছাড়াও অধিক লাভের আশায় অবৈধ ব্যাবসায়ী ও চোরাকারবারিরা অবৈধভাবে পাচার করে দিচ্ছে প্রানীটিকে।
যার কারনে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তারা। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে আগামী ৪০ বছরে আমেরিকায় এই কাঁকড়ার সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
এসব কাকড়া গত প্রায় ৩০ কোটি বছর ধরে বিবর্তনহীন অবস্থায় পৃথিবীতে বাস করে আসছে। তাই এদেরকে জীবন্ত জীবাশ্মও বলা হয়।
শুধু তাই নয়, ডাইনোসরের চেয়েও প্রায় ২০ বছর আগে পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিল লিমুলাস নামক এই প্রানীর।
আজও এটি প্রানী বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বিস্ময় হয়েই রয়ে গেছে।