আরব সাগরের পাড়ে অবস্থিত স্বপ্নের নগরী মুম্বাই সমগ্র বিশ্বের কাছে ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছে।
সমুদ্রবেষ্টিত এ শহরটি পৃথিবীর কাছে বলিউড সিটি নামেই অধিক পরিচিত। মুম্বাইকে বিনোদনের শহর অথবা ফিল্ম ষ্টারদের শহর বললেও ভুল হবে না।
এখানে নির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শাহরুখ-সালমান-আমির খান থেকে শুরু করে কিংবদন্তি অমিতাভও বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলেছেন দ্যা সিটি অফ ড্রিমসকে।
বেশিরভাগ ভারতীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীদের বাসস্থান মুম্বাইয়ে। বিশেষ করে এ শহরে অবস্থিত বান্দ্রা এলাকায় ফিল্ম ষ্টারদের বসবাস বেশি। পছন্দের তারাকাদের একবার দেখার জন্য ভক্তরা প্রায়ই এখানে আসেন।
কখনো না থেমে থাকা এই শহরে অসংখ্য সিনেমার শুটিং হয়। মুম্বাইকে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়ে থাকে।
ভারতের বহু পরিচিত প্রাক্তন এবং বর্তমান ক্রিকেট তারকারাও মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকাতে বসবাস করতে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। বিসিসিআই এর সদর দপ্তরও মুম্বাই শহরে রয়েছে।
বৃহৎ মানের শিল্প ও তাদের দপ্তরের অবস্থানের কারণে ভারতের অর্থনীতির মধ্যমনি হিসেবে বিরাজমান মুম্বাই। এতে মোট দশটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র রয়েছে।
জাঁকজমকপূর্ণ এবং সদা ব্যস্ত এই শহরে ভারতবর্ষের সবথেকে বেশি সংখ্যক ধনী ব্যক্তিরা বসবাস করেন।
মহান ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট জামসেদজী টাটার বসবাস এই মুম্বাই শহরেই ছিলো। এছাড়া বর্তমানেও বহু নামি ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিত্বের বসবাস আছে এখানে।
বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি রিল্যায়ান্স গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির বিলাসবহুল বাড়িটি মুম্বাইয়ে অবস্থিত। ২৭ তলা বিশিষ্ট এই বাড়ির উচ্চতা ৫৭০ ফুট।
তবে মুম্বাই কেবল মধ্যবিত্ত বা ধনীদের শহর নয়। এতে যেমন গগনচুম্বী ইমারত দেখা যায়, তেমনি দেখতে পাওয়া যায় সারি সারি বস্তি। সমগ্র এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ বস্তি ধারাভি এই মুম্বাই শহরে রয়েছে।
পর্যটকদের কাছেও সর্বদা স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত এক শহরের নাম মুম্বাই। জনবহুল শহরটিতে ভারতবর্ষ থেকে মানুষ আসে নানা স্বপ্নের খোঁজে।
মুম্বাই শহরটি অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ। এতে সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে পিকনিক স্পট সহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
ভারতের বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত মুম্বাইয়ের সবচেয়ে বড় মনুমেন্ট "গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া।" আকর্ষণীয় এ স্থানে দর্শনার্থীরা বেড়াতে আসেন।
হলুদ ব্যাসল্ট পাথর এবং নিরেট কংক্রিটের তৈরী এই গেটটি বিংশ শতাব্দীর দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠে।
সবসময়ই লোকে লোকারণ্য থাকে এই জায়গাটি। গেটওয়ে দিয়ে প্রবেশ করতে কোনো টিকেটের প্রয়োজন হয় না। এর পাশেই অসংখ্য ছোট বোট রয়েছে, যেগুলোতে চড়ে আরব সাগরে ভেসে বেড়ানো যায়।
গেট অফ ইন্ডিয়ার কাছেই বিখ্যাত এবং আলোচিত পাঁচতারকা হোটেল তাজের অবস্থান। তাজমহল প্যালেস পর্যটকদের কাছে তাজ হোটেল নামেই অধিক পরিচিত।
এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পাঁচ তারকা লাক্সারি হোটেল। এই হোটেল নির্মান নিয়ে একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে।
মুম্বাইয়ের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জামশেঠজী টাটা সে সময়ের বিখ্যাত হোটেল ওয়াটসন’সে থাকতে গিয়ে জানতে পারেন, এটি শুধুমাত্র সাদা চামড়ার সাহেবদের জন্য। সেই অপমানবোধ থেকে টাটা তাজমহল প্যালেস তৈরী করেন।
সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশে তাজই ছিলো প্রথম হোটেল যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ, আমেরিকান পাখা, জার্মান এলিভেটর, টার্কিশ বাথরুম এবং লাইসেন্সড বার ছিলো।
বর্তমানে ৫৬০টি কক্ষ এবং ৪৪টি স্যুইট বিশিষ্ট এ হোটেল দেখাশোনা করার জন্য ১৬০০ স্টাফ কর্মরত রয়েছে।
দক্ষিণ মুম্বাই এ অবস্থিত মেরিন ড্রাইভ এর অফিশিয়াল নাম “নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস রোড”।
আকৃতি ইংরেজী বর্ণ 'C' এর মতো হওয়ায় রাতের বেলা উঁচু ভবন থেকে দেখতে মেরিন ড্রাইভকে অনেকটা হীরার নেকলেস এর মত দেখায়।
যে কারণে একে “কুইন’স নেকলেস” নামেও অভিহিত করা হয়। বলিউডের অনেক সিনেমার শুটিং হয়েছে এই স্থানটিতে।
ছয় লেন বিশিষ্ট এই রোডকে ঘিরে নানান অভিজাত স্থাপনা গড়ে উঠেছে মুম্বাই নগরীতে। মুম্বাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই রাস্তাটিতে শহরের যেকোনো স্থান থেকে ভ্রমণ করা যায়।
অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে মেরিন ড্রাইভে ছুটে আসেন আরব সাগরের রুপ উপভোগ করার জন্য।
আরব সাগরের বুকে সাদা বর্ণের হাজী আলী দরগাহ মুম্বাই এর অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।
প্রতি বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার এই দরগাহ উপচে পড়া ভীড় দেখা যায়।
নব্বই দশকের প্রথমভাগে অভিনেতা সঞ্চয় দত্ত’র “আতিশ” মুভিটিতে এই দরগাহ অন্যতম লোকেশন ছিল। এছাড়াও অনেক বলিউড সিনেমার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে দরগাহতে।
তীর থেকে ৫০০ মিটার দূরে এটি অবস্থিত। এখানে যাওয়ার জন্য সমুদ্রের বুক চিড়ে পাথুরে এক পথ চলে গিয়েছে।
পূর্ণ জোয়ারের সময় পুরো দরগাহটি মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন হয়ে যায়, তখন তীর হতে নীল জলের মাঝে সাদা দরগাহটি এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
এছাড়াও সমুদ্র বেষ্টিত মুম্বাই শহরে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সৈকতের নাম জুহু বিচ।
শহরের নির্জন ও ব্যতিক্রমী সমুদ্রসৈকত ব্যান্ডস্ট্যান্ড, যেখানে দেখা মিলবে প্রকাণ্ড সব পাথরের।
পূর্বে এই শহরের নাম ছিলো বোম্বে। তবে বর্তমানে মুম্বাদেবীর নাম অনুসারে শহরের নাম মুম্বাই রাখা হয়েছে।
মুম্বাই এক অসাধারণ শহর, যা একযোগে বিনোদন, ব্যয়বহুল, ফিল্ম স্টার ও ক্রিকেট স্টারদের শহর এবং পর্যটকদের কাছে স্বর্গরাজ্যের এক শহর।