
ফেলে দেয়া মাছের আশ এখন বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। যা রপ্তানী করে মাসে আয় হচ্ছে লাখ টাকা। শুনতে অবাক লাগলেও বাংলাদেশের অনেকেই এখন এই ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। মাছের আশ প্রক্রিয়াজাত করনের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোয়। পরবর্তীতে যা ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র, কৃত্রিম কর্নিয়া, ওষুধ, মাছ ও মুরগির খাবার, নেইলপালিশ, লিপস্টিকসহ নানা প্রসাধনি সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাতকৃত এই মাছের আশ বৈদেশিক ডলার উপার্জনে ভুমিকা পালন করছে। বর্তমানে প্রতি বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছের আঁশ রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বিভিন্ন দেশে এসব আঁশ নানা দরকারি ও বিলাস পণ্যের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দিনকে দিন এটি অর্থকরী পন্যে রুপান্তর হচ্ছে, যা ভাগ্যের চাকা খুলে দিচ্ছে অনেকেরই। বর্তমানে এই আঁশ থেকে রূপান্তরিত পণ্য উৎপাদনের প্রবণতাও বাড়ছে। ফলে দেশে মাছের আঁশের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে চলছে।এছাড়া মাছের আশের সাথে সাথে মাছের ফুলকা, পিত্ত, চর্বিও বিক্রি হচ্ছে, যা দিয়ে আরো অনেক রকমের জিনিস তৈরি হচ্ছে বর্তমানে। কুমিল্লার পাশাপাশি যশোরের শহরের বড় বাজারসহ আশেপাশের সব বাজারের বটি ওয়ালারা মাছের নাড়িভুড়ি ও আঁশ বিক্রির কাজ করে থাকেন। আবার কেউ কেউ বাসা বাড়ি থেকেও মাছের আঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন বর্তমানে। যা তাদের আলাদা একটি আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, মাছের আঁশে কোলাজেন ফাইবার আ্যামাইনো এসিড এর মত কয়েকটি গুণ আছে। যার ফলে এই আঁশ দিয়ে তৈরি পাউডার- ঔষুধ শিল্প, প্রসাধনী শিল্প ও খাদ্য শিল্পসহ পরিবেশ রক্ষার নানা সামগ্রি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোলাজেন ফাইবার উপাদান শক্তি উৎপন্ন করে। রিচার্জেবল ব্যাটারিতে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্নে চীন ও জাপান এই আঁশ ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া মাছের আঁশ সংগ্রহের ফলে পরিবেশও দূষণ মুক্ত হচ্ছে বলে পরিবেশবীদদের ধারণা।মাছের আঁশ সংগ্রহ করার পর সেই আঁশ গুলো পরিষ্কার পানিতে অথবা অল্প গরম পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এগুলো এমন ভাবে পরিষ্কার করা হয় যেন মাছের গায়ে লেগে থাকা তৈলাক্ত পদার্থ সম্পূর্ণ ধুয়ে যায়। অন্তত দুই দিন শুকালে তা মচমচে হয়। রোদে শুকিয়ে এগুলোকে ঝরঝরে করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। আঁশের সঙ্গে অন্য জিনিস যেমন পাখনা, লেজের অংশ, কানের অংশ, গাছের পাতা ইত্যাদি ঢুকে যায়, যা বাছাই করে ফেলে দিতে হয়। পরে এগুলো ২৫ কেজি করে প্যাকেট করা হয়। কেউ কেউ অবশ্য মিক্সার গ্রান্ডারে আশগুলোকে গুড়ো করে পাউডার আকারেও বিক্রি করেন। তবে মাছ হিসেবে আশের দামও ভিন্ন হয়। রুই, কাতলার মত বড় মাছের আঁশের দাম একটু বেশি। আবার চিংড়ি মাছের মাথার খোসার দাম আরেক রকম। মাছের ফুলকার দামও আলাদা। প্রতিটা মাছের চর্বিরও দাম ভিন্ন।ক্রেতারা সাধারনত হাট-বাজার থেকে মাছ কিনে ঝামেলা এড়াতে দোকানেই আঁশ ছড়িয়ে কেটে নেন। আগে ব্যবসায়ীরা মাছ কাটার পর আঁশগুলো ফেলে দিলেও এখন সেই ফেলনা আঁশ বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। মাছের আশে বিভিন্ন উপাদান থাকায় এটি লিপস্টিক ও নেইল পলিশের উজ্জ্বল্যভাব ধরে রাখা এবং মেকআপ ও ব্রাশ তৈরিতে কাজে লাগে। এ ছাড়া মাছের আঁশে ‘বায়ো অ্যাভসরবেন্স ক্যাপাসিটি’ উপস্থিত থাকে। এ কারণে আঁশ দ্বারা তৈরি পাউডার কপার ও সিসার মতো হ্যাভি মেটাল জাতীয় পদার্থের দূষণ রোধে খুবই কার্যকরী।মাছের আঁশে কোলাজেন থাকায় কৃত্রিম কর্ণিয়া ও কৃত্রিম হাড় তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। অ্যামাইনো অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণে মাছের আঁশের পাউডার বিভিন্ন দেশে স্যুপের সঙ্গে পুষ্টি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।এই মাছের আশ প্রতিকেজি প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও করোনা মহামারীর আগে এগুলো ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো।তবে সরাসরি রফতানির সুযোগ না থাকায় মাছের আশ বিক্রেতাগণ চাহিদা অনুযায়ী লাভ করতে পারছেন না। ভবিষ্যতে যদি সরাসরি রপ্তানির সুযোগ পান, তবে আশানুরূপ লাভবান হবেন এবং ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



