বরিশালকে বলা হয় বাংলার ভেনিস। অসংখ্য খাল আর নদী দিয়ে ঘিরে থাকা এই বিভাগটি সব দিক থেকেই অনন্য। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও পাবেন না।
আছে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ফ্লোটিং মার্কেটের আদলে গড়ে উঠা ভাসমান পেয়ারা বাজার থেকে শুরু করে সাগর কন্যা কুয়াকাটা। উজিরপুর উপজেলার সাতাল গ্রামের শাপলা বিল প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়।
ভোলার চরফ্যাশনে বানানো হয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু ওয়াচ টাওয়ার। পটুয়াখালীতে আছে দেশের একমাত্র পানি জাদুঘর, যেখানে সংরক্ষন করা হয়েছে বাংলাদেশের ৭০০টি নদ নদীর পানি ও তার ইতিহাস।
ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই বরিশাল। জেলাটিতে থাকা সরকারি ব্রজমোহন কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বরিশাল বিভাগের দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সমুদ্র কন্যা হিসেবে পরিচিত কুয়াকাটা। এটি পটুয়াখালী জেলার একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত।
এখানে রয়েছে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক পরিচ্ছন্ন সমুদ্র সৈকত। যাকে আরো বেশি আকর্ষনীয় করে তুলেছে উপকূলে থাকা নারিকেল গাছের সারি।
কুয়াকাটা এই উপমহাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। সি বিচে দাড়িয়ে মায়াবী সূর্যোদয় উপভোগ আর রক্তিম সূর্যের আভা মিশিয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য যে কারো জীবনেই স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ভ্রমন পিপাসুরা একেবারে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ পাবেন স্থানটিতে আসলে। কারন
কক্সবাজারের মতো শহুরে চাকচিক্য এখনো গ্রাস করেনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কুয়াকাটাকে।
থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেটের খ্যাতি রয়েছে পুরো বিশ্বজুড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগেও যে এমন কয়েকটি ভাসমান বাজার আছে, তা জানা নেই অনেকের।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার অন্তর্গত স্বরূপকাঠির কীর্তিপাশা খালের উপর অবস্থিত পেয়ারা বাজার।
ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারা বাগান। প্রতিবছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে মৌসুম।
এই সময়টাতে প্রতিদিন ভোরে চাষীরা নৌকা ভর্তি পেয়ারা নিয়ে হাজির হোন ভাসমান বাজারে। ছোট ডিঙিতে করে খালের মধ্য দিয়ে সারিবদ্ধভাবে কৃষকদের সে যাত্রা এক মোহময়ী দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
সকাল ১১টার মধ্যেই বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায় এখানে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে ভাসমান বাজারের ব্যাস্ততা। সিজন শেষ হয়ে গেলেই সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
তাই ভালোভাবে উপভোগের জন্য সেখানে যেতে হবে জুলাইয়ের শেষ দিকের সময়টাতে। তখন চলে পেয়ারার ভরা মৌসুম, তাই চাষী ও ব্যাবসায়ীদের আনাগোনা থাকে সবচেয়ে বেশি।
বরিশাল বিভাগে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমির নাম সাতলা গ্রামের শাপলা বিল। বরিশাল সদর থেকে যার দূরত্ব মাত্র ৬০ কিলোমিটার।
গ্রামটির প্রায় ১০ হাজার একর জলাভূমিতে শাপলার চাষ করা হয়। লাল, সাদা এবং বেগুনি- এই তিন ধরনের ফুল পাওয়া যায় এখানে। তবে সবচেয়ে বেশি আধিক্য রয়েছে লাল শাপলার।
নৌকায় করে বিলের যত গভীরে যাবেন, ততই আপনার চোখে ধরা দিবে দারুন মুগ্ধতা। যেটি আরো বাড়িয়ে দিবে ছোট ডিঙিতে করে শিশুদের শাপলা তোলার দৃশ্য।
এক সময় খুব বেশি পরিচিতি না থাকলেও বর্তমানে বেড়েছে বিলটির জনপ্রিয়তা। তাই সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটক সমাগম ঘটছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে।
সাতলা গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ শাপলা চাষের সাথে জড়িত। তাদের হাত ধরেই এসব ফুল চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
বরিশালের ভোলার চরফ্যাশনে আইফেল টাওয়ারের আদলে নির্মিত হয়েছে উপমহাদেশের সর্বাধিক উচ্চতা বিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ার। জ্যাকব টাওয়ার নামের এই স্থাপনাটি ২২৫ ফুট উচু।
এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ১৯ তলা বিশিষ্ট টাওয়ারের প্রতিটা তলায়
৫০ জন ও পুরো অংশে ৫০০ জন দর্শক অবস্থান করতে পারবেন।
চূড়ায় উঠার জন্য সিড়ির পাশাপাশি রয়েছে ক্যাপসুল লিফট। সর্বাধিক উচ্চতায় গম্বুজ আকৃতির ওয়াচ পয়েন্ট স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ঘেরা।
সেখানে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চক্ষমতার বাইনোকুলার। এর সাহায্যে পর্যটকরা দূরবর্তী স্থান দেখতে পারবেন।
জ্যাকব টাওয়ারের নির্মান কাজ ২০১৩ সালে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। এটির নকশা করেছেন স্থপতি কামরুজ্জামান লিটন। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা।
বরিশাল বাংলাদেশের একমাত্র বিভাগ যেখানে ঢাকা থেকে নৌপথে যাওয়া যায়। লঞ্চে করে ৮ থেকে ১০ ঘন্টার সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা যে কোন পর্যটকের জীবনে স্মরনীয় হয়ে থাকবে।
এসব লঞ্চে যেমন রয়েছে স্বল্প মূল্যের ডেক, তেমনি আছে পাচ তারকা হোটেলের সমতূল্য কেবিন। তাই যে কেউ তার সামর্থ্য অনুযায়ী ভ্রমনকে রাঙিয়ে তুলতে পারবেন।
অবশ্য পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বরিশাল যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষই সময় বাচাতে সড়ক পথ বেছে নিচ্ছেন। তাই ভাটা পড়েছে লঞ্চ ব্যবসায়।