গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন হোটেল জাপানের “নিশিয়ামা ওনসেন কিউকান”।
৭০৫ সালে ফুজিয়ারা মাহিতো নামের এক ব্যক্তি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বংশধরেরা বিগত ৫২ প্রজন্ম ধরে হোটেলটি পরিচালনা করছে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে, তারা কিভাবে হোটেলটি টিকিয়ে রেখেছে, তা অত্যন্ত রহস্যজনক ব্যাপার। ধারণা করা হয়, এখানে থাকা গরম পানির হ্রদ গুলোই দীর্ঘকাল বিশ্বজুড়ে হোটেলের সুখ্যাতি ধরে রেখেছে।
অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই হ্রদের পানিতে গোসল করলে অনেক কঠিন অসুখ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
পানিতে স্নান করে নারীরা নিজেদের চেহারায়, অন্যরকম উজ্জ্বল আভা দেখতে পান বলে জানা গেছে। সেজন্যেই ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা এখানে ছুটে আসেন।
৭০৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকে, এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার হোটেল ভবনের সংস্কার করা হয়েছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে কক্ষগুলো।
রিসোর্টের আরও একটি আকর্ষণ হলো মনমাতানো প্রাকৃতিক ভিউ। জাপানের হায়াকাওয়া শহরে অবস্থিত এই রিসোর্টটি পাহাড় এবং ঘন জঙ্গল দিয়ে আচ্ছাদিত।
এর মধ্যে রয়েছে জাপানের দীর্ঘতম পাহাড় মাউন্ট ফুজি। হোটেলের একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে অপূর্ব সুন্দর হায়াকাওয়া নদী। অতিথিরা নিজেদের কক্ষ থেকে নদী এবং পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।
আশেপাশের নির্মল বাতাস, পাখির কিচিরমিচির শব্দ মিলিয়ে, শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে পারেন অতিথিরা।
শহুরে ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে একটুখানি প্রশান্তির খোঁজে, জাপানের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে, বহু তারকারা এখানে ছুটে আসেন।
অতিথিদের থাকার জন্য এতে রয়েছে ৩৭ টি কক্ষ। জাপানের ঐতিহ্যবাহী স্টাইলে সাজানো হয়েছে এগুলো। পাশাপাশি অতিথিদের আরাম আয়েশের কথা ভেবে, রাখা হয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা।
প্রতিটি কক্ষের সাথে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বেতের চেয়ার এবং ছোট্ট টি টেবিল দিয়ে সাজানো হয়েছে বারান্দা গুলো। সকালে কিংবা সন্ধ্যেবেলায়, সেখানে বসে চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে উপভোগ করা যাবে প্রকৃতি।
রিসোর্টের অভ্যন্তরে ২টি এবং বাইরে ৪টি গরম পানির হ্রদ রয়েছে। বাইরের হ্রদ গুলোতে পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে দেখতেই স্নান করা যায়। হাজার বছর ধরে পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত হয়ে আছে এসব লেক।
হ্রদগুলোর পানি যে ঔষধি গুণাগুণ সম্পন্ন, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। ক্লান্তি, অবসন্নতা থেকে শুরু করে মাংসপেশীতে ব্যথা সারাতে, চমৎকার কাজ করে এই পানি। পাশাপাশি, ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও কার্যকর।
অতিথিরা এই পানিতে স্নান করে শরীরের ক্লান্তি দূর করেন। অনেকে এখানকার পানি সরাসরি পান করে থাকেন।
আবার কেউ চাইলে হ্রদের পরিবর্তে বাথরুমেও গোসলের পর্ব সেরে নিতে পারেন। এজন্য অতিথিদের কক্ষের ভেতরেই রাখা হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। বাথরুমের পানিগুলোও সরাসরি গরম পানির হ্রদ থেকে সরবরাহ করা হয়।
এখানেই শেষ নয়, নিশিয়ামা রিসোর্ট, অতিথিদের মুখরোচক খাবার পরিবেশনের জন্যেও সমানভাবে বিখ্যাত। এখানকার খাবারের স্বাদ জাপানের যেকোনো হোটেল রেস্টুরেন্টের চেয়ে একধাপ এগিয়ে।
প্রতিটি পদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা হয়, নিকটবর্তী পাহাড় এবং নদী থেকে। দক্ষ রাঁধুনির হাতে সেই উপকরণ থেকে তৈরী হয় অতিথিদের খাবার।
হোটেলের মেন্যুতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী জাপানী খাবার থেকে শুরু করে সবকিছু। সবচেয়ে বিখ্যাত পদগুলোর একটি কশু বিফ। বলা হয়ে থাকে, নিশিয়ামায় এসে এই খাবার চেখে না দেখা অনেক বড় বোকামী।
রিসোর্টটি যেখানে অবস্থিত সেই এলাকাটি জাপানের জনপ্রিয় হাইকিং ও স্কি এরিয়া। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পর্যটন মৌসুমে এই এলাকা গুলোতে, দেশি-বিদেশি ভ্রমণপ্রিয় মানুষের আনাগোনা থাকে।
এক্ষেত্রে, থাকার জন্য তাদের প্রথম পছন্দ নিশিয়ামা রিসোর্ট। হাজার বছরের পুরাতন ঐতিহ্য, জিভে জল আনা খাবার, আরামদায়ক এবং শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে, সারাবছর অতিথিদের ভীড় সামলাতে হিমশিম খায় হোটেল কর্তৃপক্ষ।
তবে, হাজার বছর ধরে এত বড় পরিসরের একটি হোটেল পরিচালনা করা, মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে, হাজার বছর ধরে একই পরিবারের মধ্যেই ব্যবসা ধরে রাখার নজির পৃথিবীতে অনেক কম।
তারপরেও এই রিসোর্টের জৌলুস এতটুকুও কমেনি। প্রতিবছর বিভিন্ন মৌসুমে নিত্য নতুন রূপে সেজে ওঠে হোটেলটি।
বসন্তে গোলাপী চেরি ফুলে ভরে যায় আশেপাশের গাছপালা। হেমন্তে আবার পাহাড়-জংগল মিলে কমলা-হলদে রংয়ে সেজে ওঠে রিসোর্টের আশপাশ।