
পণ্যদ্রব্য বিনিময়ের একটি সার্বজনীন মাধ্যম টাকা। যেকোন জিনিসই টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়। কিন্তু কেমন শোনাবে যদি টাকাকেই কিনে নিতে হয়? আফ্রিকার বহুল আলোচিত দেশ সোমালিয়া থেকে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথক হয়ে যাওয়া একটি দেশ সোমালিল্যান্ড, সেদেশেই দেখা যায় এমনই একটি হতবুদ্ধিকর ব্যাপার। সেখানে ফল কিংবা সবজির মতই কেজি দরে বিক্রি হয় হাজার হাজার টাকার নোট! শুধু তাই নয়, কোন রকম নিরাপত্তা ছাড়াই পণ্যদ্রব্যের মত টাকাও বান্ডিল করে সাজিয়ে রাখা হয় খোলা বাজারে। সোমালিল্যান্ডের মুদ্রার নাম সোমালিল্যান্ড সিলিং। আন্তর্জাতিক বাজারে এই মুদ্রার মান অত্যন্ত কম। ১ ডলারের বিনিময়ে ৮ থেকে ৯ হাজার সোমালিল্যান্ড সিলিং খরচ করতে হয়।আর কেও যদি ১০ ডলার ভাঙাতে চায় তাহলে বান্ডিল ধরে ধরে সিলিং বিনিময় করতে হয়।আন্তর্জাতিক বিনিময় ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বেচাকেনার ক্ষেত্রেও- সামান্য কিছু কিনতে গেলে অনেক বেশী সোমালিল্যান্ড সিলিং খরচ করতে হয়।এদেশে কেউ একটি সিগারেট কিনতে চাইলে খরচ করতে হয় ৫০০ সিলিং! বাজারের ব্যাগ ভরে সবজি কিনতে চাইলে সাথে নিয়ে যেতে হয় এক ব্যাগ ভর্তি সিলিং!আর যদি কেউ মূল্যবান কোন গহনা কিনতে চায়, তাহলে যে পরিমাণ সোমালিল্যান্ড সিলিং প্রয়োজন হবে, তা হাতে কিংবা ব্যাগে নয়; বরং ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যেতে হবে!এসব কারণেই সোমালিল্যান্ডের রাস্তাঘাটে প্রায়ই ঠেলাগাড়ি ভর্তি টাকা নিয়ে অধিবাসীদের যাতায়াত করতে দেখা যায়। আমরা ঠেলাগাড়িতে মালপত্র দেখতেই অভ্যস্ত, তাই এমন বিপরীত চিত্র নিঃসন্দেহে ভিনদেশীদের কাছে পরম বিস্ময়কর। এদেশে আমাদের মত ৫ টাকা বা ১০ টাকার মতো ক্ষুদ্র অংকের নোট নেই। রয়েছে ১০০, ৫০০, ১০০০ ও ৫০০০ টাকার নোট। তবে এতো এতো টাকার নোট বহন করা অসুবিধা বলে, দেশটিতে মোবাইল ব্যাংকিং প্রচলিত আছে। দোকানে গিয়ে অনেকেই টাকার নোটের পরিবর্তে এখন মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেন করে থাকে।এই দেশের আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার হল, এরা বিদেশ থেকে সেই গাড়িগুলো আমদানি করে- যেগুলোর স্টিয়ারিং বামদিকে।কিন্তু দেশে নিয়ে এসে গাড়িগুলোকে কারখানায় পাঠিয়ে স্টিয়ারিং খুলে ডানদিকে লাগানো হয়, আর গাড়ি চালানো হয় রাস্তার ডানদিক দিয়েই।পরিবেশ পরিস্থিতির দিক দিয়ে সোমালিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত দেশ সোমালিল্যান্ড। সোমালিয়ায় যেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করে, সোমালিল্যান্ড সেইদিক দিয়ে একেবারেই শান্তিপূর্ণ একটি দেশ।সোমালিয়ার জলদস্যুরা পৃথিবী কুখ্যাত। কিন্তু পার্শ্ববর্তী এই সোমালিল্যান্ডে নেই কোন প্রকার হানাহানি কিংবা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ। তারপরও একে দুর্ভাগাদের দেশ বলা হয়, কারণ আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে সোমালিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে তারা। তবুও এখনো দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। অথচ দেশটির রয়েছে নিজস্ব সরকার, সংবিধান, এমনকি পুলিশ ও সেনাবাহিনী! পৃথিবীর কোন দেশ থেকেই স্বীকৃতি না পাওয়া সোমালিল্যান্ড বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবেই অবস্থান করছে। দরিদ্র এই দেশে শিক্ষা গ্রহণকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। আসলে এখানে চাকরি পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ শিল্প কিংবা সেবা খাতে খুব একটা উন্নতি করতে পারে নি সোমালিল্যান্ড। তাই উচ্চশিক্ষিত হলেও সেই অনুযায়ী মিলবে না কোন চাকরি। মুসলিম প্রধান এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ছোটখাটো কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে।দেশটির কিছু অঞ্চল মরুভূমি হওয়ায় সেখানে প্রচুর উট বিচরণ করে বেড়ায়, আর এদেশ থেকে সৌদি আরবে উট রফতানিও করা হয়। বর্তমানে দেশটি পর্যটনের উপরও কিছুটা নির্ভর করছে। কারণ এখানে রয়েছে পৃথিবীর কিছু রহস্যময় গুহা আর জঙ্গল, যা দেখতে অনেক অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষ ছুটে আসেন। সোমালিল্যান্ডের প্রধান খাবার উটের মাংস আর ভাত। উৎসবের সময় এশিয়ান দেশগুলোর মত সোমালিল্যান্ডের মেয়েরাও হাতে মেহেদির আলপনা তৈরি করে।



