

নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা ওশেনিয়া মহাদেশের একটি শান্তিপূর্ণ দ্বীপ দেশ নিউজিল্যান্ড। সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বসবাসযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ড অন্যতম।এদেশে যেমন দেখা যায় নির্মল আকাশ, তেমনি রয়েছে স্বচ্ছ এবং নীল সাগরের জল। তাই নিউজিল্যান্ডকে বলা হয় সাদা মেঘ আর সাগর কন্যার দেশ। নিসর্গের মতই স্নিগ্ধ ও নম্র দেশটির অধিবাসীরাও। নিউজিল্যান্ডের মেয়েরা পৃথিবীর সুন্দরতম মেয়েদের মধ্যে অন্যতম। তারা দৃষ্টিনন্দন পোশাক পরে এবং মেকাপ করে চলাফেরা করতে পছন্দ করে। সৌন্দর্য রক্ষার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সচেতন। নারীদের জন্য নিউজিল্যান্ডকে সবচেয়ে নিরাপদ দেশ মনে করা হয়। নারীরা এখানে নিরাপদে একা একা ভ্রমণ করতে পারে। এমনকি মাঝরাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ তাদের বিরক্ত করে না। এদেশে নারী ও পুরুষকে সমান চোখে দেখা হয়। পৃথিবীর অনেক স্থানেই নারী ও পুরুষের বেতনের স্কেলে বৈষম্য দেখা যায়।কিন্তু নিউজিল্যান্ড এই দিক দিয়ে প্রায় মুক্ত। একারণেই এদেশের নারীরা অপেক্ষাকৃত সুখী।সাধারণত একটি দেশের জাতীয় সংগীত একটিই হয়। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সেই দেশ যার দুটি জাতীয় সংগীত রয়েছে। দেশটির মানুষ যেমন স্বাস্থ্য সচেতন, তেমনই সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। কারণ অধিকাংশ মানুষই নিজেদের ফার্মে উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূল এবং দুগ্ধজাত পণ্য খেয়ে থাকে।তাছাড়া শরীরকে ফিট রাখতে এখানকার ৮৪ শতাংশ মানুষই- হয় মর্নিং ওয়াক না হয় ইভিনিং ওয়াক করে থাকে। জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়ে শীর্ষ স্থানীয় দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দেশটির মানুষ দায়িত্বশীল এবং অতিথিপরায়ণ।এদেশের একটি নিয়ম হল, এখানে ১৪ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েদের বাড়িতে একা রেখে বাবা মা বাইরে যেতে পারে না। এদেশে প্রতি কাজের জন্যই একটি বয়স নির্ধারণ করা আছে। যেমন গাড়ি চালাতে চাইলে বয়স কমপক্ষে ১৫ বছর হতে হবে।আর অ্যালকোহল পানের জন্য ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ব্যক্তি স্বাধীনতার এই দেশে ১৬ বছর বয়স হলেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বৈধতা দেয়া হয়। নিউজিল্যান্ডই পৃথিবীর প্রথম দেশ, যারা নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করেছিল। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিক দিয়ে পৃথিবীতে দেশটি ৩য় অবস্থানে আছে।যেকোন নতুন কাজ অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের মানুষের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। বলা হয়, এদেশে নতুন কোন ব্যবসা শুরু হতে সময় লাগে মাত্র ১ দিন! এরা ব্যবসার সুবিধার্থে যেকোন পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এতে কোন সরকারি বাধা নেই। এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধের বিজ্ঞাপনও উন্মুক্তভাবেই দেয়া হয়। এছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবেও সুখ্যাতি রয়েছে নিউজিল্যান্ডের। এখানে ঘুষ প্রদান ও গ্রহণ একটি ঘৃণ্য কাজ হিসেবে বিবেচিত। নিউজিল্যান্ডের মানুষকে টাকা পয়সা খুব একটা বের করতে দেখা যায় না, কারণ এখানে কাগজী মুদ্রার চাইতে ক্রেডিট এবং ডেবিট কার্ড বেশী ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এদেশের কোথাও সাপ দেখা যায় না। কিন্তু যদি কখনো কেউ সাপ দেখে থাকে, তাহলে সাথে সাথে পুলিশকে ফোন করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এদেশেই সবেচেয়ে বেশী পরিমাণ হেলিকপ্টার রয়েছে। একসময় দেশটির সরকার জঙ্গলে হরিণের সংখ্যা গোনার জন্যও হেলিকপ্টার ব্যবহার করত! নিউজিল্যান্ড এমন এক দেশ, যেখানে ইংরেজির সাথে সাথে ইশারা ভাষাকেও রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে।মাওরি এই দেশের আদিম অধিবাসী। দেশটির কিছু অংশে এখনও মাওরি সংস্কৃতি দেখা যায়। কিউই পাখি নিউজিল্যান্ডের জাতীয় প্রতীক। উড়তে না পারা এই পাখিটি কেবল এদেশেই পাওয়া যায়। নিউজিল্যান্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন জাতের সাদা ভেড়া চরে বেড়ায়, যারা পশমের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ভেড়ার পশম থেকে উল উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে ২য় স্থান অধিকার করেছে। পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে ভেড়ার ফার্ম হাউজ। ডেইরি শিল্পে প্রসিদ্ধ এই দেশের মোট অধিবাসীর তুলনায় ভেড়া আর গরুর সংখ্যা বেশী। প্রতি একজন মানুষের বিপরীতে ভেড়ার সংখ্যা ৯ টি।এই ভেড়াগুলো থেকে নিউজিল্যান্ডে উৎকৃষ্টমানের মাংস, মাখন, পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এদেশের ব্লু লেককে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ জলাশয় হিসেবে ধরা হয়। বেটাবা নামের পাখনাবিহীন এক জাতীয় পোকা শুধু মাত্র নিউজিল্যান্ডেই পাওয়া যায়।বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, এই পোকাটি ১৯ কোটি বছর পৃথিবীতে টিকে আছে কোন রকম দৈহিক বিবর্তন ছাড়াই!এদেশে এমন একটি প্রজাতির ইল মাছ রয়েছে, যারা ৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে- আর জীবনের একদম শেষভাগে এসে মাত্র একবারই প্রজনন করে থাকে! পেঙ্গুইনের দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ড পর্যটনের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।তবে নিউজিল্যান্ডের মানুষ তাদের দেশের বাইরে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। প্রতি বছরই তারা নতুন নতুন দেশ ভ্রমণে বের হয়।স্বাধীন দেশ হলেও, ব্রিটেনের রাজা এখনও নিউজিল্যান্ডের প্রশাসনিক প্রধান। নিউজিল্যান্ড ধর্ম বৈচিত্র্যের দেশ।এখানকার অর্ধেক মানুষই কোন ধর্মে বিশ্বাস করে না। আর বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ স্থানীয় ধর্মের অনুসারী রয়েছে। দেশটির শতভাগ মানুষ শিক্ষিত, কারণ এখানে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এভারেস্ট পর্বতে পা রাখা প্রথম ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন স্যার এডমণ্ড হিলারি, যিনি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।


