শহরের প্রতিটি বাসিন্দার ই রয়েছে একটি করে বিমান। বিমানেই করেই তারা রোজ অফিসে যান। জরুরি কাজ কিংবা সাপ্তাহিক ছুটিতেও ব্যবহার করেন নিজস্ব বিমান। বলছি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোনিয়ার অঙ্গরাজ্যে থাকা ক্যামেরুন এয়ার পার্কের কথা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে 'বিমানের শহর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এটি। এই শহরে ছোট-বড় রাস্তা কিংবা ওলি-গলি বলে কিছু নেই।
একটাই পথ, যার পুরোটাই ব্যবহৃত হয় রানওয়ে হিসেবে। ব্যস্ত রাস্তায় চলন্ত গাড়িকে পাশ কাটিয়ে এখানে বিমান চলে বিনা বাধায়।
মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার বহু বিমান অকেজো হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বিমানচালকের সংখ্যাও হু হু করে বাড়তে থাকে।
১৯৩৯ সালে ৩৪ হাজার থেকে ৭ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা দাঁড়ায় চার লক্ষে।
যুদ্ধে অংশ নেয়া সেই অবসরপ্রাপ্ত বিমানচালকদের উপভোগ্য অবসর দানের লক্ষ্যেই ফ্লাই ইন রেসিডেন্সিয়াল কমিউনিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাশপাশি অকেজো বিমানপোত গুলিতেই অবসরপ্রাপ্ত বিমানচালকদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকার বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ।
অবসর জীবনে চেনাজানা পরিবেশে থাকতে বিমানচালকদের ভাল লাগবে, এই ধারণা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৩ সালে তৈরি করা হয় ক্যামেরন পার্ক।
প্রথমে ক্যামেরন পার্ক এয়ারপোর্ট নাম থাকলেও সেই নাম বদলে রাখা হয় ক্যামেরন এয়ারপার্ক।
শহরের প্রতিটি পরিবারেরই কোনও না কোনও সদস্য এক সময়ে বিমানচালক ছিলেন।
পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এরকম প্রায় ছয়শো চল্লিশটি ফ্লাই ইন কমিউনিটি। এদের মধ্যে ছয়শো দশটিই রয়েছে আমেরিকায়।
তবে ফ্লাই ইন কমিউনিটির সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী ক্যামেরন এয়ার পার্ক সবার উপরে অবস্থান করছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত এই এয়ার পার্ক একষট্টি একর জমির উপর গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে মাত্র একশত চব্বিশটি বাড়ি রয়েছে।
শহরের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ একসময় পেশাদার বিমান চালক ছিলেন।
অন্যান্য শহরের লোকজন যেভাবে বাসার গ্যারেজে গাড়ি রাখে, সেভাবে ক্যামেরন এয়ারপার্ক এলাকার বাসিন্দারা তাদের বাড়ির হ্যাঙ্গারে বিমান রাখে।
আট দশটা শহরে বাস ট্যাক্সি যেভাবে চলে এখানে প্লেনও চলে সেভাবে. এই শহরে উড়োজাহাজের মালিক হওয়া সাধারণ গাড়ির মালিক হওয়ার মতো বিষয়।
ক্যামেরুন এয়ার পার্কে বাড়ির উঠান থেকে রানওয়ে পর্যন্ত অনায়াসে বিমান চালিয়ে যাওয়া যায়। সেজন্য শহরের রাস্তাকে যথেষ্ট প্রশস্ত করা হয়েছে।
প্রায় একশো ফুট প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে বিমান ওঠা নামা করতে পারে। এসব রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আটানব্বইটি বিমান ওঠানামা করে।
ছোট্ট শহর হলেও সুযোগ সুবিধার কোন কমতি নেই এখানে। স্কুল, বাজার, হাসপাতাল, শপিং মল সহ প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে।
বিশ্বের অনেক শহরে যেমন পুরনো ঐতিহ্যবাহী গাড়ির প্রদর্শনী করা হয়, এখানে তেমনি বিমানেরও প্রদর্শনী হয়।
বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে বিমানগুলো রানওয়ের দুই পাশে সাজিয়ে রেখে প্রদর্শিত করা হয়। রানওয়ে ধরে একসঙ্গে সেই সব বিমানের উড়ান নেয়ার দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন অনেক দর্শনার্থী।
পুরো শহরে হাতে গোনা ১২৪টি বাড়ি থাকলেও এ ২০টি বাড়ি ফাঁকা পড়ে রয়েছে এখনও।
মাঝে মধ্যে আবার সেই সব বাড়ি সস্তায় বেচেও দিচ্ছেন মালিকরা। কিছুদিন আগে এমন একটি বাড়ির বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
ইন্টারনেটে দেওয়া সেই বিজ্ঞাপনে বিমানের হ্যাঙ্গার-সহ একটি বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। সেখানে বাড়িটির দাম চাওয়া হয়েছিল মাত্র ছ’লক্ষ ৮৫ হাজার ডলার।