১৯৭৩ সালের ঘটনা। ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের তৎকালিন ভাইস প্রেসিডেন্ট যাত্রা করেছেন ফ্লাইট ৩১৮ তে চড়ে। বিমান আকাশে থাকা অবস্থায় তার পাশের সিটে বসেছিলেন বিমানের ক্যাপ্টেন।
কিছুক্ষন গল্প গুজব ও করেছিলেন তারা। এরপর হঠাৎই ভাইস প্রেসিডেন্টের খেয়াল হয় যে, ক্যাপ্টেন যদি তার সাথেই বসে থাকেন তাহলে বিমান চালাচ্ছে কে?
একথা ভেবে তিনি উঠে ব্যবস্থা নিতে যাবেন, তখনই সবচেয়ে বড় চমকের মুখোমুখি হন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
তিনি পাশের লোকটির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেন, ওই লোকটি সেদিনের বিমানের ক্যাপ্টেন নয়। বরং 'ফ্লাইট ৪০১' এর ক্যাপ্টেন রবার্ট অ্যালবিন লফট।
বিষয়টি বুঝতে পেরে ভয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান ভাইস প্রেসিডেন্ট। কারণ সেদিন থেকে আরো এক বছর আগেই দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়ে গেছে ফ্লাইট ৪০১।
বিমানের যাত্রীদের সাথে মারা গেছেন ফ্লাইট ৪০১ এর ক্যাপ্টেন রবার্ট অ্যালবিন লফট। তাহলে এক বছর পর অন্য এক ফ্লাইটে তিনি আসলেন কিভাবে?
ভূতুড়ে এই রহস্যের সূত্রপাত আরো এক বছর আগে। ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ১৬৩ জন যাত্রী নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে যাত্রা করে ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট-৪০১।
বিমান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সবাই বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন। ক্যাপ্টেন লফটের বিমান উড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল ২৯ হাজার ঘন্টা থেকেও বেশি।
রাত ১১ টা ৩২ দিকে বিমান মায়ামি এয়ারপোর্টে অবতরণের কাছাকাছি পৌছে যায়। কিন্তু বিপত্তিটা বাধে শেষ মুহুর্তে।
অবতরণের জন্য ল্যান্ডিং গিয়ার নামাতে গিয়ে ক্যাপ্টেন লক্ষ করেন, নোজ গিয়ারের সাথে যুক্ত ইন্ডিকেটরের আলো জ্বলছে না।
বিমান ল্যান্ডিং বা টেক অফের সময় এই আলো জলে উঠে। এর মাধ্যমে ক্যাপ্টেন বুঝতে পারেন, ল্যান্ডিং গিয়ার খুলেছে কিনা।
ফ্লাইট ৪০১ এর ল্যান্ডিং গিয়ার না খোলায় পাইলটরা বুঝতে পারেন বিপদ আসতে যাচ্ছে। তাই বিমানটিকে ২ হাজার ফুট উচ্চতায় রেখে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার কে ডেকে আনেন তারা।
ইঞ্জিনিয়ার বিমানের সবকিছু ভালোভাবে পরীক্ষা করেন। কিন্তু সবকিছু ঠিক থাকলেও ল্যান্ডিং গিয়ারের আলো কোনভাবেই জলছিল না। ইঞ্জিনিয়ার নিচে গিয়েও চেষ্টা করে দেখেন। কিন্তু কোন ভাবেই নোজ ল্যান্ডিং গিয়ারের খুলতে পারলেন না।
এরকম অবস্থায় বিমান অবতরণ করানো কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই পাইলটরা সিদ্ধান্ত নিলেন, বিমানটি আকাশেই হোল্ডিং পজিশনে রাখবেন।
কিন্তু পাইলটদের অজান্তে বিমানটি নিজে নিজেই নিচের দিকে নামতে লাগলো। বিষয়টি পাইলটরা টেরও পেলেন না।
এক সময় বিমান মাত্র ৯০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসে। তখন বিমানটিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন লফট।
এ সময় তাকে বিমানের উচ্চতা কমে যাওয়ার কথা জানান সহকারি পাইলট। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। পাইলট লফট ঘুরিয়ে ফেলেছেন বিমান।
ফলে যা হবার তাই হয়। পাশের জলাভূমিতে আছড়ে পড়ে ফ্লাইট ৪০১। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারাণ বিমানের পাইলট সহ ৯৬ জন যাত্রী। তবে ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছিলো। সেখান থেকে কিছু কিছু যন্ত্রাংশ পরবর্তীতে মেরামত করে ফ্লাইট ৩১৮ বিমানে লাগানো হয়।
এরপর থেকেই শুরু হয় ভুতুড়ে ঘটনা। ফ্লাইট ৩১৮ এর কর্মীরা বিমানের মধ্যে মারা যাওয়া সেই ক্যাপ্টেন এবং পাইলটদের দেখতে পেতেন। এমনকি অনেক সময় বিপদের জন্য সতর্কও করতেন তারা।
একবার মারা যাওয়া বিমানের ইঞ্জিনিয়ার লুইস এরকম সতর্ক করে বলেছিলেন, ফ্লাইট ৩১৮ তে আগুন লাগার সম্ভাবনা আছে। পরে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখা যায় সত্যিই এমন সম্ভাবনা ছিলো।
এরকম ঘটনা শুধু একবারই নয়, বহুবার ঘটেছে। ধ্বংস হওয়া বিমানের ক্যাপ্টেন কিংবা পাইলট ফ্লাইট ৩১৮'র কর্মীদের সতর্ক করেছেন আগাম বিপদ বার্তা জানিয়ে। এমনকি তাদের কারণে অনেক বার বেঁচে গেছে ফ্লাইট ৩১৮।
কিন্তু এরকম ঘটনা কিভাবে সম্ভব, তার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এসব কিছুকেই ভূতুড়ে বলে আখ্যায়িত করেছেন সবাই।
১৯৭৮ সালে এই ঘটনা নিয়ে সিনেমাও তৈরি করা হয়েছে। এরপর পেরিয়ে গেছে আরও কয়েক যুগ, কিন্তু ফ্লাইট ৪০১ রহস্যের কোন সমাধান আজও পাওয়া যায়নি।