বাল্যবিবাহ ও যৌতুকমুক্ত গ্রাম নাটোরের হুলহুলিয়া। যা ইতোমধ্যে আদর্শ গ্রামের তকমা অর্জন করেছে।
প্রায় ২০০ বছর ধরে গ্রামটিতে প্রবেশ করেনি কোনো পুলিশ। এমনকি কোনো মামলার রেকর্ডও নেই এখানে।
জেলা সদর থেকে ৩৭ কিলোমিটার এবং সিংড়া থানা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে, ছায়াঢাকা ও শান্ত এক গ্রাম হুলহুলিয়া। প্রবেশ ফটকেই বড় বড় অক্ষরে লিখা থাকে 'আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া'.
২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের গ্রামটিতে বসবাস করে প্রায় ৬ হাজার মানুষ। চলন বিলবেষ্টিত এ গ্রাম ১৩টি পাড়া নিয়ে গঠিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি, তাদের রয়েছে নিজস্ব গঠনতন্ত্র। ১৫ পৃষ্ঠার এই গঠনতন্ত্র দ্বারা, একটি পরিবারে আবদ্ধ হয়েছেন এখানকার বাসিন্দারা।
তাদের মধ্য নেই কোনো নিরক্ষরতার ছাপ, নেই যৌতুক কিংবা বাল্যবিবাহের প্রচলন। এখানকার ছয় হাজার বাসিন্দার মধ্যে, অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত।
বেশিরভাগই কর্মরত আছে, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থার উচ্চ পদে। যারা গ্রামে বসবাসরত ও কর্মক্ষম, তাদের কাজের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।
হুলহুলিয়ার অত্যাবশক কিছু নিয়মের মধ্যে একটি হলো, এস এস সি পর্যন্ত লেখাপড়া সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। এর আগে মেয়েদের বিবাহ দিতে পারবে না পিতা মাতা।
দরিদ্র্যদের লেখাপড়ার জন্য রয়েছে তহবিল। ফলে বাংলাদেশের শতভাগ শিক্ষিত গ্রামের খেতাব অর্জন করেছে এটি।
গ্রামের বাসিন্দারা মনে করেন, উচ্চশিক্ষার জন্যই এখানকার মানুষেরা সচেতন। ফলস্বরূপ বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না।
ছোট কোনো অপরাধ ঘটলেও, গ্রামবাসীরা সেটির সমাধান করে নেন দ্রুত। যদি নিজেদের মধ্যে সমাধান না হয়, তাহলে তারা মুখাপেক্ষী হোন সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের। এটিই গ্রামবাসীর বিচারের সর্বোচ্চ স্থান৷
২৩ সদস্যের সামাজিক উন্নয়ন পরিষদে একজন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস-চেয়ারম্যান ও ২১ জন নির্বাহী সদস্য থাকেন। এ ছাড়া কমিটির বাইরে পাঁচজন উপদেষ্টাও থাকেন।
দুই বছর পরপর গ্রামবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরিষদ নির্বাচিত হয়। গ্রামের পুরুষ ভোটারদের ভোটে এ পরিষদ গঠিত হয়। এটি গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে।
হুলহুলিয়ার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, পাড়ার সদস্যরা কোনো বিচারকার্য সমাধান করতে না পারলে, তারা আবেদন করবেন সামাজিক উন্নয়ন পরিষদে।
সেখানেও সমাধান না হলে, ৩০ দিনের মাঝে আশ্রয় নিতে হবে দেশের প্রচলিত আইনের। তবে এখনো থানা পর্যন্ত যাওয়ায় প্রয়োজন হয়নি এ গ্রামের কোনো সদস্যের।
উন্নত এই গ্রামে রয়েছে একটি মসজিদ, মন্দির, কওমি মাদরাসা, ডাকঘর, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চবিদ্যালয় ও আইসিটি ট্রেনিং সেন্টার।
আইসিটি ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে অনলাইনে আয়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করা হয়েছে। ফলে এখানে বেকাত্বের সমস্যা নেই বললেই চলে।
হুলহুলিয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে, ‘শিকড়’ ও ‘বটবৃক্ষ’ নামের দুটি অরাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠানের সদস্য সবাই চাকরিজীবী।
তাদের অনুদানে গ্রামের অভাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেয়া, অসহায় মানুষকে সহায়তা ও বেকারদের কর্মসংস্থান করা হয়।
এছাড়াও রয়েছে কমিউনিটি সেন্টার ও রেস্ট হাউজ। এ কমিউনিটি সেন্টার অন্য গ্রামের মানুষদের কাছে ভাড়া দোওয়া হলেও, স্থানীয়দের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রী।
সবরকমের অপরাধমুক্ত হুলহুলিয়া গ্রামের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাজ পরিচালনা, আশপাশের গ্রামবাসীদের আকৃষ্ট করে।
এজন্যই অন্যগ্রাম থেকে মানুষ এখানে আসেন নীতিমালা নিতে। আর সে নীতিমালা নিয়ে গিয়ে সমাজ গঠনে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেন তারা।