রেল লাইনের উপরে বসেছে বিশাল বাজার। হর্ন দিতে দিতে ছুটে আসছে ট্রেন। শব্দ পেয়ে মুহুর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে যায় দোকানের জিনিসপত্র।
ট্রেন চলে গেলে আবার সবকিছু হয়ে যায় আগের মতো। জিনিসপত্র কেনাবেচা নিয়ে চলে হাকডাক। এমন অদ্ভুত দৃশ্যের দেখা পাওয়া যায় থাইল্যান্ডে।
বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে মাছ-মাংস, শাক-সবজি কিনছেন সাধারণ মানুষ। ক্রেতাদের ভীড় সামাল দিতে ব্যস্ত সময় কাটছে দোকানীদেরও।
হঠাৎ-ই ট্রেন আসার শব্দে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল বাজার জুড়ে। মুহুর্তের মধ্যেই দোকান পাট সরিয়ে ট্রেন যাওয়ার জন্য যায়গা করে দিলেন বিক্রেতারা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝিক-ঝিক শব্দ তুলে বাজারের বুক চিড়ে চলে যায় ট্রেন। আবারও জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানীরা।
থাইল্যান্ডের সামুত সংখ্রাম প্রদেশের ম্যাকলং মার্কেটে এই ঘটনা বেশ স্বাভাবিক। দিনে আটবার এমন আজব দৃশ্য দেখা যায় সেখানে।
বাজারের ভেতর দিয়ে কেমন করে ট্রেন যায়, শুধুমাত্র সেটা দেখতেই অনেকে ভীড় জমান এখানে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকেন, কিভাবে মুহুর্তের মাঝেই দোকানপাট গুটিয়ে রেললাইন খালি করে দিয়েছে দোকানীরা।
পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বাজার হিসেবেও নামডাক আছে ম্যাকলং এর। কিন্তু ঠিক কেন রেললাইনের এমন বিপজ্জনকভাবে বাজার গড়ে উঠেছে?
ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, মূলত বাজারটিই এখানে আগে গড়ে উঠেছিল। সেটা ১৯০৫ সালের কথা। সেই সময় বাজারের ভেতর দিয়ে এভাবে ট্রেন যাতায়াত করত না।
সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এখানকার স্থানীয়রা। সেগুলোই বিক্রি করা হত ম্যাকলং মার্কেটে। এভাবেই খেয়ে-পরে দিন কাটত তাদের।
একসময় এখানে রেললাইন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সহজ উপায়ে এখানকার টাটকা সামুদ্রিক মাছ, শাক-সবজী ও ফলমূল থাইল্যান্ডের অন্যান্য প্রদেশে পাঠানোই ছিল উদ্দেশ্য।
অতঃপর বাজারের ভেতর দিয়ে তৈরী করা হলো ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন। আগের মতোই চলতে থাকল বাজার।
প্রতিদিন ভোর ছ’টা ২০ মিনিটে ম্যাকলং মার্কেট ক্রেতা সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। কেনাবেচা চলে সন্ধ্যে ৫টা ৪০ পর্যন্ত।
মূলত, এই দু’টি সময়েই বাজারের মধ্য দিয়ে দিনের প্রথম এবং শেষ ট্রেনটি যায়। এছাড়াও আর কোন কোন সময় ট্রেন বাজারের ভেতর দিয়ে যাবে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে।
সে অনুযায়ী প্রস্তুত থাকেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও, অনেক দূর থেকেই ট্রেন আসার শব্দ শোনা যায়। বারবার হর্ন দিয়ে লোকজনকে সতর্ক করে দেন চালক।
যার কারণে, বিপজ্জনক হলেও তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি এখানে। ক্ষয়ক্ষতি হয়নি মালামালেরও।
ট্রেনের আগমন দেখা ছাড়াও, বাজারে ঘুরে সময় কাটাতে পারবেন পর্যটকেরা। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক মাছের বাজার গুলোর একটি এটি।
পাওয়া যাবে বিভিন্ন সুস্বাদু টাটকা ফল এবং শাক-সবজীও। তুলনামূলক কম খরচে তাজা পণ্য কেনা যায় এখান থেকে।
থাইল্যান্ডের বাজারগুলো এমনিতেই অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সেদিক থেকে ম্যাকলং রেলওয়ে মার্কেটও পিছিয়ে নেই।
ব্যাংকক থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বাজার। চাইলে ট্রেনে চেপেই বাজারটি ঘুরে দেখা যাবে। এজন্য ব্যাংকক এর ওংওয়াই আন স্টেশন থেকে ধরতে হবে ম্যাকলং গামী ট্রেন।
এই ট্রেনটিই যাবে বাজারের মধ্য দিয়ে। ম্যাকলং মার্কেট থেকে খানিকটা সামনের স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে ফিরে আসা যাবে বাজারে।
আশেপাশে ঘুরে দেখার মতো আরও বেশকিছু জায়গা আছে এখানে। এই তালিকায় রয়েছে থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বাজারগুলো।
ম্যাকলং মার্কেট থেকে খানিকটা দূরে অবস্থিত, থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার
ড্যামনোয়েন সাদুয়াক ফ্লোটিং মার্কেট।
সেখানে দীর্ঘ এক খালে অনেকগুলো নৌকায়, বিভিন্ন রকম জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানীরা। খাবার দাবারের সামগ্রী থেকে শুরু করে জামা-কাপড় পর্যন্ত সব-ই আছে এখানে।
চাইলে বোটে চেপে খালের পানিতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন পর্যটকরা। প্রতিদিন-ই দেশি বিদেশি পর্যটকদের কোলাহলে মুখরিত থাকে ড্যামনোয়েন সাদুয়াক ফ্লোটিং মার্কেট।
সবমিলিয়ে, বাজার করার পাশাপাশি অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে, সবারই অন্তত একবার হলেও এখানে আসা উচিত।