পুরুষ হয়েও করেছেন গর্ভধারণ। জন্ম দিয়েছেন ফুটফুটে এক সন্তান। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বৈপ্লবিক কান্ডটি ঘটেছে ভারতের কেরালা রাজ্যের কোজিকোডে।
এখন শিশু ও জন্মদাতা দুজনেই সুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। কিছুদিন রেস্ট নেয়ার পর, ছুটি দিয়ে দেয়া হবে তাদেরকে।
এই ঘটনায় তোলপাড় পড়ে গেছে, ভারত সহ পুরো বিশ্বে। ভাইরাল হয়েছে নেট দুনিয়ায়। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, কিভাবে সম্ভব হয়েছে পুরুষের পক্ষে সন্তান জন্মদান?
ভারতের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার দম্পতি জাহাদ ও জিয়া পাবেল। তাঁদের মধ্যে জিয়া জন্মগতভাবে পুরুষ হলেও, তার মধ্যে ছিল মেয়েলি অনেক বৈশিষ্ট্য।
অর্থাৎ দৈহিকভাবে সে পুরুষ থাকলেও, আচরনগত ভাবে ছিলেন নারী। তাই পরে অপারেশনের মাধ্যমে, লিঙ্গ পাল্টে নারী হয়ে উঠেন।
অপরদিকে জাহাদের জন্মগত লিঙ্গ পরিচয় ছিল নারী। তবে ছেলেদের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায়, তিনিও অস্ত্রোপচার করে পুরুষ হয়েছেন।
তাদের কোল আলো করে, গত ৮ই ফেব্রুয়ারী পৃথিবীতে এসেছে নতুন অতিথী। নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কিছুটা আগেই পৃথিবীর আলো দেখেছে আলোচিত নবজাতক।
মাত্র ৮ মাসের গর্ভাবস্থায় ছিলেন জাহাদ। সবকিছু চলছিল ঠিকঠাকভাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই সুগার লেভেল বেড়ে যাওয়ায় হাটতে হয় ভিন্ন পথে।
গঠন করা হয় একটি স্পেশালাইজড মেডিকেল প্যানেল। সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সিজারিয়ান অপারেশন করেন, গভার্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দক্ষ ডাক্তাররা।
গত বুধবারে জন্মের সময় শিশুটির ওজন ছিল ২ কেজি ৯২০ গ্রাম। তবে সন্তানের লিঙ্গ সম্পর্কে জাহাদ-জিয়া বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি।
সদ্য পিতা মাতা হওয়ার অনুভূতি পেলেও, লিঙ্গ রুপান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি জাহাদ এবং জিয়া পাবেল। ছয় মাস পর থেকে পুনরায় হরমোন থেরাপি নেয়া শুরু করবেন দুজনেই।
বেশ কিছু দিন ধরেই খবরের শিরোনামে ছিলেন, রূপান্তরকামী জুটি জিয়া ও জাহাদ। মাতৃত্বকালীন ফটোশুট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে, হয়েছিলেন আলোচিত।
নেটমাধ্যমে যথেষ্ট চর্চা হয়েছে তাঁদের নিয়ে। দুজনকেই শুনতে হয়েছে অনেক কটুক্তি। পেরোতে হয়েছে পাহাড়সম বাধা। তবে সন্তান লাভের অনুভূতির কাছে সেসব অতি তুচ্ছ।
বর্তমানে জাহাদের বয়স ২৩ বছর। অপরদিকে জিয়া পাবেল পেড়িয়েছেন ২১ এর কোটা। ৩ বছর আগে একে অপরের প্রেমে পড়েছিলেন তারা। এরপর থেকে একসাথেই বসবাস করছেন।
প্রথমে তারা একটি সন্তান দত্তক নিয়ে, বাবা মা হওয়ার শখ পূরন করতে চেয়েছিলেন। এর জন্য আবেদন করেছিলেন সরকারি এজেন্সিতে।
স্বাভাবিক ও যোগ্য দম্পতিরাই যেখানে সন্তান দত্তক নেয়ার অনুমতি পাচ্ছে না, সেখানে ট্রান্সজেন্ডার জুটির আবেদন করা নিয়েও, প্রশ্ন তোলা হয়েছিল সেই সময়।
এরপর সিদ্ধান্ত নেন, নিজেরাই প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারনের চেষ্টা করবেন। জাহাদ এখন পুরুষ হলেও, জন্মগত ভাবে নারী ছিলেন। তাই তার পেটেই সন্তান সৃষ্টি হওয়া সম্ভব ছিল।
সেক্স পরিবর্তনের জন্য, এরইমধ্যে অপারেশন করে সে স্তন কেটে ফেলেছিল। কিন্তু জরায়ু এবং সন্তান ধারণে প্রয়োজনীয় অন্যান্য জননাঙ্গ, তখনো বাদ দেওয়া হয়নি৷
একসময় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে, দুজনেই লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য চলমান হরমোন থেরাপি নেয়া বন্ধ করে দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের চেষ্টা সফল হয়েছে।
তবে যাত্রাটা মোটেও সুখকর ছিল না জাহাদের জন্য। জিয়ার ভালোবাসা এবং সন্তান লাভের প্রত্যাশা, অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার উপহার পেয়ে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ট্রান্সজেন্ডার দম্পতি।
স্বপ্ন পূরণে তাঁদের যাঁরা সাহায্য করেছেন, সেই চিকিৎসক ও আত্মীয় পরিজনদের, ধন্যবাদ জানান রূপান্তরকামী এই জুটি৷ একইসাথে জানিয়েছেন নিজেদের জীবন যুদ্ধের কথা।
এমন ঘটনার পর, ট্রান্সজেন্ডার দম্পতিকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে। সকল চিকিৎসা ফ্রি করে দেয়ার পাশাপাশি, "ব্রেস্ট মিল্ক ব্যাংক" থেকে, মাতৃদুগ্ধ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যান্য যে কোন সমস্যায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, হেলথ ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে। কিন্তু বাবা মা দুজনেই ট্রান্সজেন্ডার হওয়ায়, ইতিমধ্যে সন্তানের পিতৃ পরিচয় নিয়ে খানিকটা ঝামেলার সৃষ্টি হয়েছে।
সন্তান পেটে ধারণ করা জাহাদকে বাবা, ও জিয়াকে মা হিসেবে রেজিস্টার করতে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষে অনুরোধ জানিয়েছেন আলোচিত দম্পতি। তবে সেখান থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।