ভালোবাসা দিবস মানেই কাপলদের মাঝে ফুলের আদান-প্রদান। আর এই সুযোগে ব্যাবসায়ীরা আয় করে নেন কোটি কোটি টাকা।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই যেন ব্যস্ততার ধুম লেগে যায় ফুলের বাজারে। পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, ভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে, ফুলের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। আর মাস না পেরোতেই মার্চ মাসে আছে স্বাধীনতা দিবস।
এসব দিনকে কেন্দ্র করে, বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকে যশোরের ঝিকরগাছার ফুলচাষীদের। সেখানে রীতিমতো হাটবাজার বসিয়ে বিক্রি করা হয় বিপুল পরিমাণ ফুল।
পরিস্থিতির ব্যতিক্রম হয়নি এবারেও। চার দিবসকে কেন্দ্র করে, দেড়শ থেকে দুইশ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করার আশায় দিন গুণছেন চাষীরা।
ব্যস্ত ফেব্রুয়ারি মাসকে কেন্দ্র করে, ব্যতিক্রমধর্মী ফুলের মেলা বসে যশোরের ঝিকড়গাছায়। বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত ফুলমেলায়, প্রতিবছর ভিড় জমান ব্যবসায়ী এবং ফুলপ্রেমীরা।
দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের যোগান আসে এই অঞ্চল থেকে। স্বাভাবিকভাবেই দিবসকেন্দ্রিক মাসগুলোতে, এখানে থাকে উপচে পড়া ভিড়। সুযোগ আর চাহিদা বুঝে ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই বেড়েছে সব ধরনের ফুলের দাম।
মাসখানেক আগেও মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়া গোলাপের দাম, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ২০ টাকার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়। মানভেদে কোনো কোনো গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।
এছাড়া বর্তমানে জারবেরার দাম ২০ টাকা। সেইসাথে বেড়েছে রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদাসহ, প্রায় সব ধরনের ফুলের দাম। মৌসুমের এই সময়ে ফুলের এমন দাম বৃদ্ধিতে বেশ খুশি চাষীরা।
পুরো যশোরে এবার প্রায় ১ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়েছে। ৬ হাজার ফুলচাষী নিরলসভাবে ফুল উৎপাদনের কাজ করে চলেছেন।
জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, হাড়িয়া, পানিসারা, নাভারণ, নির্বাসখোলার বিভিন্ন মাঠে এখন শুধুই ফুলের সমারোহ।
যশোরের এসব মাঠে উৎপাদিত ফুলের মাঝে রয়েছে গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, জিপসি, রডস্টিক, কলনডালা, চন্দ্রমল্লিকা, টিউলিপসহ আরো অনেক জাতের ফুল।
ভালোবাসা দিবস আর পহেলা ফাল্গুনের কথা মাথায় রেখে, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই ফুলের পেছনে বিনিয়োগও শুরু করে দিয়েছেন চাষীরা। বিশেষ করে গোলাপের মাথায় কুঁড়ি ফুটলেই, তাতে পড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সাদা ক্যাপ।
মূলত ফুল দেরিতে ফোটার জন্যই বাড়তি এই ব্যবস্থা। নির্ধারিত দিনে মানুষের কাছে সতেজ ফুল পৌছে দেয়ার তাগিদেই, বাড়তি বিনিয়োগে ঝুঁকছেন কৃষকরা। আর তাতে ফুলের দামও বাড়ছে একটু একটু করে।
সবমিলিয়ে চার দিবসকে কেন্দ্র করে, রীতিমতো সাজসাজ রব এখন, ফুলের রাজধানী নামে পরিচিত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায়।
প্রায় একইরকমের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়া গ্রামে। গোলাপগ্রাম নামে খ্যাত এই অঞ্চলে, প্রতিদিনই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ফুলচাষীরা।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায়, এখানকার গোলাপের চাহিদাও থাকে তুঙ্গে।
চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায়, নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন কৃষকরা। করোনা পরবর্তী সময়ে বেশ কিছুদিন লোকসানের মুখে পড়লেও, চলতি বছর থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তাদের।
বিরুলিয়ার গ্রামগুলোতে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে, সারাবছরই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গোলাপের চাষ চলে। তবে ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাসকে কেন্দ্র করে, বাড়তি চাহিদার যোগান দিতে হয় চাষীদের। যার ফলে ফুলের দামও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
অবশ্য নামে গোলাপ গ্রাম হলেও, এখানে প্রতিনিয়ত বিদেশী জাতের জারবেরা আর গ্লাডিওলাস উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছর প্রায় আড়াই কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে চলেছেন এসব ফুলচাষী।
এছাড়াও ফুলের জন্য বিখ্যাত দেশের আরো বেশ কিছু অঞ্চলেও একইরকমের দৃশ্য চোখে পড়বে। সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলাতেও বর্তমানে চলছে ফুলচাষীদের সুসময়।
বেশিরভাগ কৃষকই এবার মাঠে নেমেছেন, লাখ টাকার অধিক মুনাফার প্রত্যাশা নিয়ে। সবমিলিয়ে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসের চার দিবসকে কেন্দ্র করে, পুরো দেশে কয়েকশ কোটি টাকার ফুল বিক্রির ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রতিনিয়ত বিদেশী ফুলের আমদানি নিয়েও চিন্তিত দেশের ফুলচাষীরা। একইসাথে সার, বীজ এবং কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। চাষীদের ভাষ্য, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে, দেশের ফুল চাষে আরো বেশি গতি সঞ্চার হবে।