কেজি দরে আইফেল টাওয়ার বিক্রি! তাও একবার নয় দু দু বার! খোদ ফ্রান্স সরকারকে টুপি পড়িয়ে প্রতারক হাতিয়ে নিয়েছিলো ৭০ হাজার ফ্রাংক তথা ফরাসী মুদ্রা!
শুনতে সিনেমার গল্পের মতো মনে হলেও, অসম্ভব এই কাজটিকেই সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন ভিক্টর লাস্টিগ নামের এক অস্ট্রিয়ান।
বিখ্যাত এই প্রতারকের প্ল্যান এতটাই নিখুত ছিল যে, বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থাও এসব ব্যাপারে কিছুই জানত না। পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটার পর, সবাই হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলো না!
এমনকি আইফেল টাওয়ারের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনা বিক্রি করার পরেও, বিন্দু পরিমান টের পায়নি ফ্রান্স সরকার। জানাজানি হওয়ার পর, কর্তৃপক্ষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছিল। প্রতারককে ধরাও সম্ভব হয়নি।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯২৫ সালে কাজের প্রয়োজনে প্যারিসে অবস্থান করতেন ভিক্টর লাস্টিগ। হঠাৎই একদিন পত্রিকায় দেখতে পান, আইফেল টাওয়ার রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।
এমন সংবাদ চোখে পড়ার পরপরই মাথায় কুবুদ্ধি চলে আসে ভিক্টরের। মনে মনে ফন্দি আটেন কিভাবে একে কাজে লাগানো যায়। অনেক ভাবনা চিন্তার করে একটা দারুন আইডিয়াও বের করে ফেলেন।
শুরুতে তিনি বেশ কিছু অনুর্বর মস্তিষ্কের লোক খুঁজে বের করেন এবং তাদের নিয়ে এক ভলটাভুটির আয়োজন করেন। অপশান ছিলো দুটি- আইফেল টাওয়ার কি ভেঙে ফেলা উচিৎ নাকি সংরক্ষণ করা উচিৎ?
প্রায় সবাই টাওয়ারটি ভেঙে ফেলার পক্ষে ভলট দিয়েছিলো।
আর এতেই ভাগ্য খুলে যায় তার। দ্বিতীয় ধাপে শুরু করে দেন জাল দলিল-দস্তাবেজ তৈরির অপকর্ম। অত্যন্ত গোপনভাবে এটিও শেষ করে ফেলেন।
কেউ আঁচও করতে পারেনি যে, আইফেল টাওয়ারের মতো স্থাপনা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, ভাঙারি হিসেবে বিক্রি হতে যাচ্ছে।
সবকিছু রেডি করে টেন্ডারের ডাক দেন প্রতারক। বেশকিছু টেন্ডার জমা হয় তার কাছে। সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে, ঠকানো সহজ হবে এমন কয়েকজনকে বাছাই করা হয়।
এরপর গোপনে একদল ভাঙারি ব্যবসায়ীকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে দাওয়াত করেন। সবার কাছে তিনি নিজের পরিচয় দেন ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে।
সবার সাথে কথা বলে, আন্দ্রে পয়সন নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলেন লাস্টিগ। তাকে বুঝাতে সক্ষম হোন, বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় সরকার বাইরে প্রকাশ করবেনা।
তাই পয়সনও কাউকে না জানিয়েই চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক এই সময়েই নিজের বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন লাস্টিগ। পরোক্ষভাবে ঘুষ দাবি করেন টেন্ডার জয়ীর কাছ থেকে।
সেই ব্যক্তিও কেজি দরে আইফেল টাওয়ার কেনার লোভ সামলাতে পারেননি। এভাবে লাস্টিগ আদায় করে নেন ৭০ হাজার ফ্র্যাঙ্ক। এরপরই হয়ে যান নিরুদ্দেশ।
অনেক খোঁজাখুজির পরেও পয়সন তার দেখা পায়নি। এদিকে বিষয়টি পুলিশকেও জানাতে পারছিলেন না তিনি। কারন আইন অনুযায়ী যে কোন কাজে ঘুষ আদান-প্রদান দন্ডনীয় অপরাধ।
উভয় সংকটে পড়ে যান আন্দ্রে পয়সন।
অভিযোগ করলেই জেলে যেতে হবে তাকে। একইসাথে ভয় ছিল, বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে লজ্জায় পড়ার।
তবে আইফেল টাওয়ার একবার বিক্রি করে সন্তুষ্ট হতে পারেননি ভিক্টর লাস্টিগ। অর্থের লোভ তাকে আবার টেনে নিয়ে আসে প্যারিসে। পুনরায় সাজান একই ধরনের নাটক।
আগের মতোই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেন।
তবে দ্বিতীয়বার আর ভাগ্য সহায় হয়নি। পরিকল্পনা ভেস্তে যায় তার। পুলিশ জেনে যায় লাস্টিগের আইফেল টাওয়ার বিক্রির জালিয়াতি।
তবে এবারও দুর্দান্ত চালাকির প্রমান দেন বিশ্বসেরা এই প্রতারক। বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পেরে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
তাই ফ্রান্স সরকার তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। অবশ্য পালিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। বারবার ফাঁকি দেয়ার পর, শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন তিনি।
১৯৩৫ সালে তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৪৭ সালে Alcatraz Island এর ফেডারেল কারাগারে মারা যান ভিক্টর লাস্টিগ।
মৃত্যুর পরেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতাকদের একজন ধরা হয় তাকে। বাইরের দুনিয়ায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। কথা শুনে অনেকেই মোহগ্রস্থ হয়ে পড়তেন।
তাকে দেখে সবাই মুগ্ধ হতেন। এছাড়াও ছিল বিশেষ কিছু গুনাবলি। মোট পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন ভিক্টর লাস্টিগ।
দুর্দান্ত উপস্থিত বুদ্ধির পাশাপাশি, অভিনয়েও ছিলেন দারুন দক্ষ। তিনি এতোটাই সাবলীলভাবে অভিনয় করতেন যে, মিথ্যা বলা নিয়ে কারো বিন্দু পরিমান সন্দেহ হতো না।
আর এতসব ভালো গুনকে কাজে লাগাতেন প্রতারণার মতো খারাপ বিষয়ে। মানুষ ঠকানোই ছিল তার পেশা। বিভিন্ন ভাবে তিনি মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করতেন।
এর জন্য প্রতিটি অপারেশনে ব্যবহার করতেন আলাদা আলাদা ছদ্মনাম এবং পাসপোর্ট। সব মিলিয়ে লাস্টিগের ৪৭টি ছদ্মনাম এবং অসংখ্য পাসপোর্ট ছিল।
আইফেল টাওয়ার ছাড়াও, লাস্টিগের আরেকটি বিশ্বখ্যাত জালিয়াতির ঘটনা ‘রোমানিয়ান বক্স’ নামে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, এটি দিয়ে দুনিয়ার যে কোন দেশের টাকাই নকল করা যেত।