পশ্চিম ইউরোপের ছোট এক দেশ নেদারল্যান্ডস। ছোট ছিমছাম এই দেশ বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই বিষ্ময়। এ এমন এক বৈচিত্র্যময় দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে সাইকেলের দেখা মেলে বেশি। এমনই এক দেশ এই নেদারল্যান্ডস, যেখানে অপরাধী না থাকায় প্রতিবছরই বন্ধ করে দেয়া হয় কারাগার।
মাত্র কদিন আগেই মেগা কারাগার উদ্বোধনের ঘোষণা দেয় এল সালভাদর। এর পরপরই নতুন করে আলোচনায় চলে আসে নেদারল্যান্ডসের কথা। সারাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন অপরাধীদের দমন করতে কারাগার খোলা হচ্ছে, সেখানে এই দেশে অপরাধীর অভাবে বন্ধ হচ্ছে কারাগার।
নেদারল্যান্ডসের এই কারাগার বন্ধের খবর প্রথম বৈশ্বিক মিডিয়ায় পরিচিতি পায় ২০১৩ সালে। সেবার কয়েদীর অভাবে একসাথে ৮ টি কারাগার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিবছরই দেশটিতে কারাগার বন্ধের খবর পাওয়া যায়।
মূলত এর পেছনে বড় কারণ দেশটির পুলিশ ব্যবস্থা। দেশটিতে শাস্তির বদলে অপরাধীদের কাউন্সেলিং করার উপরেই বেশি মনোযোগ দেয় পুলিশ। যার কারণে খুব ছোট বয়স থেকেই একটি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বড় হয় নেদারল্যান্ডসের শিশুরা। অপরাধের পথে পা বাড়ালেও পুলিশের কাউন্সেলিং এর গুণে খুব সহজেই সেখান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক জীবন শুরু করে তারা।
কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারাগার নিয়ে কি করে নেদারল্যান্ডস। এর বিপরীতেও আছে চমৎকার এক সমাধান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার ব্যবস্থা করেছে দেশটির সরকার। যেমন শতবছরের পুরাতন De Koepel জেলকে পুরোপুরি জাদুঘরে পরিবর্তন করা হয়েছে।
আবার অবৈধ অভিবাসী এবং চোরাচালানকারীদের জন্য বিশেষায়িত এক জেল পরিণত হয়েছে পুরোদস্তুর এক রেস্টুরেন্টে। আবার এমন জেলও আছে যা বর্তমানে লাইব্রেরি এবং বিজনেস সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুধুমাত্র পুলিশ ব্যবস্থা আর সামাজিকতার কারণেই নেদারল্যান্ডসের এমন অবস্থা তা মোটেই নয়। বরং নিম্ন দারিদ্র্যহার, উচ্চ সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নত সংস্কৃতির কারণে পশ্চিম ইউরোপের দেশটিতে মানুষ খুব সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত।
নিজ দেশের প্রতি তারা খুবই সচেতন। এমনকি পরিবেশ দূষণের ব্যাপারেও বেশ সতর্ক থাকে দেশটি। আর ঠিক এ কারণেই সেখানে গাড়ির চেয়ে সাইকেলের পরিমাণই বেশি। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে সাইকেলের উপরেই বেশি জোর দেয় সেখানকার মানুষ।
দেশটিতে সাইকেল এতই জনপ্রিয়, প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ সাইকেল বিক্রি হয়। আর পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরো দেশে বর্তমানে ২৩ মিলিয়নের বেশি রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে বর্তমানে লোকসংখ্যা ৮ লাখ ২১ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু সেখানে গাড়ির সংখ্যা মোটে ২ লাখ ৬৩ হাজার। আর সাইকেলের সংখ্যা শহরের লোকসংখ্যার চেয়েও বেশি। সংগত কারণেই আমস্টাররডামকে বলা হয় পৃথিবীর সাইকেলের রাজধানী।
ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাইট কালচার ট্রিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আমস্টারডামের খালগুলো থেকে ১৫ হাজারের বেশি বাইসাইকেল তোলা হয়। আসলে এই শহরে এত বেশি বাইসাইকেল যে, লোকে খুব সহজেই ভুল করে পার্কিং থেকে অন্যজনের সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আর ভুলে নিয়ে আসা এসব সাইকেলের ঠিকানা হয় আমস্টারডামের খালগুলো।
আমস্টারডামকে খালের শহর বললেও অবশ্য ভুল হয় না। নেদারল্যান্ডসের রাজধানীতে ১ হাজার ৬০০ এর বেশি খাল রয়েছে। পুরো শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশই পানি। শহরটিতে ৫৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি জলভাগ। আর একারণেই পর্যটকদের কাছে নৌপথ ভ্রমণ এখানকার বড় আকর্ষণ। প্রতিবছর ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন যাত্রী আমস্টারডামের নৌপথ ব্যবহার করে থাকেন।
নেদারল্যান্ডসের কথা বললেই চোখের উপর ভেসে ওঠে কমলা রঙ। মূলত দেশটির রাজ পরিবারের সাথেই মিশে আছে এই কমলা রঙ। দেশটির মানুষ এই রঙকে শুধু ভালোই বাসে না, বরং রাজকীয় এবং শ্রদ্ধার চোখেও দেখে থাকে।