

আফ্রিকায় নয়, বাংলাদেশেই সন্ধান মেলেছে প্রাণীখেকো উদ্ভিদের! অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, দিনাজপুরে এমন উদ্ভিদের সন্ধান মিলেছে। যার নাম সূর্যশিশির; এটি এক প্রকার মাংসাশী উদ্ভিদ।সূর্যশিশিরের পাতাগুলো ছোট আর গোলাকার। উদ্ভিদটি আঠালো ফাঁদওয়ালা মাংসাশী উদ্ভিদের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ডোসেরা রোটানডিফোলিয়া’।দিনাজপুর সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতি শীত মৌসুমে এই উদ্ভিদের দেখা মেলে। এবারও দেখা গেছে। তবে উদ্ভিদটি বংশবিস্তার কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ভিদটি বিলুপ্তির তালিকায় আছে। দিনাজপুর সরকারি কলেজের জীববিজ্ঞান ভবনের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে পুকুরের পশ্চিম পাড়ে সূর্যশিশির দেখা যায়। ছোট আকারের এই উদ্ভিদটি মাত্র ৩.৫ ইঞ্চি বা ৮ সে.মি. চওড়া। এর পাতাগুলো ছোট এবং গোলাকার। গ্রীষ্মকালে গোলাকার পাতাগুলোর উঁচু কান্ডগুলোতে সাদা সাদা ফুল ফোটে।সূর্যশিশিরের পাতাগুলোকে উজ্জ্বল লাল রঙের দেখায়। মনে হয় ওগুলোর ওপর শিশির কণা চিকচিক করছে।লালচে শিশির বিন্দু দ্বারা আবৃত পাতাগুলো আসলে পোকামাকড় ধরার ফাঁদ। সূর্যশিশিরের পাতাগুলো বিভিন্ন উচ্চতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য বোঁটা দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রত্যেকটি বোঁটার ওপর থাকে অতি ক্ষুদ্র একটি গ্রন্থি বা অঙ্গ। যা এক ধরনের স্বচ্ছ আঠালো তরল পদার্থ উৎপন্ন করে। এই তরল পদার্থটি বোঁটাগুলোর ওপর শিশির বিন্দুর মতো জমা হয়। তরল নিঃসরণকারী গ্রন্থিটি দেখতে লাল বলে এর ওপরের তরল পদার্থটিও লালচে বলে মনে হয়।মাংসাশী উদ্ভিদের মধ্যে এই প্রজাতিটি সবচেয়ে বড়। ৪/৫ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট গোলাকার থ্যালাস সাদৃশ উদ্ভিদটির মধ্য থেকে একটি লাল বর্ণের ২-৩ ইঞ্চি লম্বা পুষ্পমঞ্জরি হয়। এই উদ্ভিদের তিন থেকে চার স্তরের পাতাসদৃশ মাংশল দেহের চারদিকে পিন আকৃতির কাঁটা থাকে। মাংশল দেহের মধ্যভাগ অনেকটা চামচের মতো ঢালু এবং পাতাগুলোতে মিউসিলেজ সাবস্টেন্স নামক একপ্রকার এনজাইম বা আঠা নিঃসৃত হয়। যা শিকার আটকাতে সহায়তা করে।এই উদ্ভিদে রয়েছে ঔষধী গুণ। এরা জন্মায় অম্ল বেড়ে যাওয়া মাটিতে, শীতপ্রবণ এলাকায়। যে মাটিতে সূর্যশিশির জন্ম নেয় সেই মাটির পুষ্টিগুণ কম থাকে। সূর্যশিশির এর পাতায় নিঃসৃত কন্ট্রাক্টার হেয়ার জাতীয় আঠার সঙ্গে রাতে শিশির জমা হয়। সূর্যের আলোতে তা চিকচিক করে। এজন্যই এই উদ্ভিদের নাম হয়তো সূর্যশিশির। সূর্যশিশির এক ধরনের সুগন্ধ বাতাসে ছড়ায়। মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় উজ্জ্বল লাল রঙ, শিশির বিন্দু আর সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে উদ্ভিদের কাছে চলে আসে। কিন্তু পোকাগুলো গাছটির পাতার ওপর নামামাত্রই উঁচু বোঁটায় থাকা তরল পদার্থে আটকে যায়। এসব প্রাণী খেয়েই বেঁচে থাকে এই উদ্ভিদ।কিন্তু বর্তমানে সূর্যশিশির উদ্ভিদটি বিলুপ্তপ্রায়। এই উদ্ভিদের জীবনকাল অল্প সময়ের। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় এর অঙ্কুরোদগম শুরু হয়ে টিকে থাকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। মরু অঞ্চলে এই উদ্ভিদ বেশি জন্মায়।মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় খেয়ে এই উদ্ভিদ বেঁচে থাকে। এটি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং বৃক্ষ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে।পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাংস খেকো গাছ পাওয়া যায়। সে সবের মধ্যে কফ, লাভস্টার, ব্লাডার ট্র্যাপ প্রজাতি উল্লেখ্যযোগ্য। এই গাছগুলো কলসির মতো দেখতে এক বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণীকে আকৃষ্ট করে। এরপর সুবিধামতো ঢাকনা বন্ধ করে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে শিকারকে ধরাশায়ী করে। এভাবেই হয় তাদের আহারের ব্যবস্থা।জানা গেছে, সূর্যশিশির উদ্ভিদ আগে দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন জায়গায় জন্মাতো। এখন তেমন চোখে পড়ে না।জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, আগারগাঁও, ঢাকা এর জীববিজ্ঞান গ্যালারিতে প্রদর্শিত উদ্ভিদটির প্রতিকৃতিতে দেয়া তথ্যমতে, বিলুপ্ত প্রায় এই উদ্ভিদটি বাংলাদেশে শুধু দিনাজপুর, রংপুর, ঢাকা জেলায় পাওয়া যেত।



