কিংবদন্তি কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার ফাইন্টেনপেন বইটি উৎসর্গ করেছিলেন সাকিব আল হাসানকে। তিনি বলেছিলেন,
সাধারণ বলপেন একবার ব্যবহার করে আর ব্যবহার করা যায়না। কিন্তু ফাউন্টেনপেনে কালি ভরে বারবার ব্যবহার করা যায়। সাকিব আমাদের ফাউন্টেনপেন!
হুমায়ূন আহমেদের এই একটা কথাই যেন বর্ণনা করে সাকিব আল হাসানের পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ার।
প্রায় ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে নানা উত্থান-পতনের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন, সমালোচনার তীর ধেয়ে এসেছে তার দিকে। তবুও মাঠে ছিলেন অবিচল, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
অভিষেকের পর থেকেই নিজের ক্রিকেটীয় মেধা আর অলরাউন্ড পারফর্ম্যান্সের কারণে দলে নিজেকে আলাদা ভাবে পরিচয় করিয়েছেন তিনি।
এখন পর্যন্ত দলে অনেক তারকা ক্রিকেটারের আগমন ঘটলেও সাকিব থেকে গেছেন স্বমহিমায়। পঞ্চপান্ডব খ্যাত পাঁচ ক্রিকেটারদের মধ্যে একমাত্র সাকিব-ই বর্তমানে তিন ফরম্যাটে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টি অধিনায়কের দ্বায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অবশ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব হাতছাড়া হয়ে গেছে।
দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের আইডল এবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে মাঠে নামছেন একঝাঁক অপেক্ষাকৃত তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে। তাই তার দিকে বাড়তি নজর থাকবে ক্রিকেট সর্মথকদের।
এমনিতেই আইসিসির বৈশ্বিক টূর্ণামেন্টে তিনি যেন আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেন। অবাক করা পরিসংখ্যান বলছে বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের জেতা সর্বশেষ ছয় ম্যাচের ছয়টিতেই ম্যাচ সেরার পুরুষ্কার জিতেছেন সাকিব।
শুরুটা ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে জেতানো ১১৪ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরার পুরুষ্কার জিতেছিলেন তিনি।
এরপর ২০১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্টইন্ডিজ এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে জেতা ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় ছিলেন সাকিব।
সর্বশেষ ২০২১ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে ওমান এবং পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে জেতা ম্যাচেও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার।
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাকিব। এখন পর্যন্ত ৩১ ম্যাচে অংশ নিয়ে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের ঝুলিতে রয়েছে ৬৯৮ রান ও ৪১ উইকেট।
চলতি বছর ব্যাট হাতে বেশ ভালো ছন্দে আছেন সাকিব। ১০ ইনিংস ব্যাট করে ৩৩ গড় ও ১৩৬ স্ট্রাইকরেটে ৩টি অর্ধ শতকের সাহায্যে করেছেন ৩০৫ রান।
সাকিবের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ঝলমলে অধ্যায় সম্ভবত ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ওই বিশ্বকাপে তাকে নতুন করে চিনেছে ক্রিকেট বিশ্ব।
টূর্ণামেন্টে আট ম্যাচে ৬০০ এর বেশি রান এবং ১১টি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। দুটি সেঞ্চুরির পাশাপাশি দেখা পেয়েছিলেন ফাইফারের-ও!
২০১৭ সালে বাংলাদেশ দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের বাদ দিয়ে সাকিবের নেতৃত্বে তারুণ্য নির্ভর টি-টুয়েন্টি দল গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন তৎকালীন হেড কোচ হাথুরা সিংহ।
এরঅংশ হিসেবে ওই বছর শ্রীলঙ্কা সফরে টি-টুয়েন্টি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। সাকিবের হাতে অধিনায়কত্ব তুলে দেওয়ার পর হাথুরা সিংহে চলে গেলে এই পরিকল্পনা আর এগোয় নি।
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর তার নিষেধাজ্ঞা সবকিছু আরও এলোমেলো করে দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো বাংলাদেশ দলের দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও দল পুর্ণগঠনের কাজে হাত দেন।
এর-ই অংশ হিসেবে ২০২১ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তামিম ইকবালকে দেখা যায়নি। এবারের বিশ্বকাপের আগে মুশফিকুর রহিমের অবসর এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে দল থেকে বাদ দিয়ে হাথুরা সিং এর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ।
যদিও নানা কারণে টি-টুয়েন্টি ফরম্যাট থেকে রাসেল ডমিঙ্গোকে সরিয়ে শ্রীধরণ শ্রীরামকে টি-টুয়েন্টি কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি!
দলে এতো পরিবর্তনের পরও ফলাফলে কোন পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশের। তাইতো চারদিকে তীব্র সমালোচনা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলের শিকার হতে হচ্ছে ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ সহ বিসিবি কর্মকর্তাদের।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আগামীকাল সকাল দশটায় নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে সাকিব আল হাসানের দল।
সাকিব কি পারবেন বিশ্বমঞ্চে আবারও জ্বলে উঠতে? নিজের সেরাটা উজাড় করে জয় ছিনিয়ে আনতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সেদিন টিভি পর্দায় তাকিয়ে থাকবে গোটা বাংলাদেশ…