ঘুরতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অকৃত্রিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাশ্চাত্য স্থাপত্যের মিশেল ভ্রমনকে আরো দুর্দান্ত রূপ দেয়।
এর জন্য সুইজারল্যান্ড কিংবা লন্ডনে যেতে হবে না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দ্বীপ দেশ শ্রীলংকায় রয়েছে এমনই এক প্রাকৃতিক বিস্ময়, যার নাম নুয়ারা এলিয়া।
ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা জন ডেভি ১৮১৯ সালে সর্বপ্রথম এই পাহাড়ি এলাকা আবিষ্কার করেন। তিনি এখানে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
তার ধারণা ছিল এখানকার আরামদায়ক শীতল আবহাওয়ায় রোগীরা খুব দ্রুত সেরে উঠতে পারবেন। কিন্তু তার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। এরপর স্যামুয়েল বেকার নামক এক পরিব্রাজকের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় শহরটি।
প্রাচীনকাল থেকে শ্রীলংকা মসলা ও নারকেল উৎপাদনের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল। একসময় পর্তুগীজরা এখানে আনাগোনা শুরু করে। এরপর পর্তুগীজদের তাড়িয়ে ডাচরা শ্রীলংকা কে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে।
সর্বশেষ ব্রিটিশদের হাতে শাসিত হয় শ্রীলংকা। আর এ সময়েই দ্রুত ইংরেজ ঔপনিবেশিক ব্যক্তিদের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নেয় নুয়ারা এলিয়া।
কারণ শ্রীলঙ্কার অন্যান্য স্থানগুলোতে অতিরিক্ত গরমে কর্মকর্তাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যেত। কিন্তু এই শহর ভৌগলিক কারণে ছিল অনেক আরামদায়ক ও শীতল। এখানে ইংরেজদের পছন্দের স্ট্রবেরি ও লেটুসপাতাও সহজে উৎপাদন করা যেত।
সেই থেকে এখানে বসবাস শুরু হয় ইংরেজদের। এখানকার স্থাপত্য শৈলিতেও পাশ্চাত্যের ছাপ স্পষ্ট। নুয়ারা এলিয়ার বাংলোগুলি যেন একেকটা লণ্ডনের বাড়িঘর। এসব কারনেই এ জায়গাটি "লিটল ইংল্যান্ড" নামে সর্বাধিক পরিচিত।
পুরো শ্রীলঙ্কা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নুয়ারা এলিয়াতে দেখার মতো অনেক সুন্দর জায়গা রয়েছে। মধ্য শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত, এই শহরটি চা বাগান সমৃদ্ধ।
চারপাশে রাশি রাশি সবুজে ঘেরা সাজানো বাগানগুলি চোখ জুড়াবে যে কোন ভ্রমণপিপাসুর। এই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাতগুলি এর সৌন্দর্যকে আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছে।
নুয়ারা এলিয়ায় কুয়াশা-ঢাকা পাহাড় এবং দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগানের মধ্য দিয়ে রয়েছে অনেক পুরনো একটি রেললাইন। এখানকার পুরনো হিল স্টেশনটির সৈান্দর্যও নজর কাড়ে সবার। এখানকার ট্রেনে ভ্রমন করা যেন স্বপ্নের মতই সুন্দর।
এখানে রয়েছে হাকগালা বোটানিক্যাল গার্ডেন। যার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বিভিন্ন রকম গোলাপের সমাহার এবং বিভিন্ন প্রজাতির ফার্ন। বিলুপ্ত প্রজাতির বানর এবং অসাধারণ সুন্দর পাখি ব্লু ম্যাগপাই রয়েছে এখানে।
এছাড়াও কাছাকাছি রয়েছে সীতা আম্মান মন্দির। এটি একটি হিন্দু মন্দির, যার স্থাপত্যশৈলি বেশ আকর্ষণীয়। ঘন জঙ্গলের মধ্যে আছে গালওয়ের ল্যান্ড ন্যাশনাল পার্ক। এটা বুলবুল এবং ফ্লাইক্যাচার সহ স্থানীয় এবং পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য।
নুয়ারা এলিয়ার একেবারে মাঝখানে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া পার্ক। এই পার্কে রয়েছে অনেক প্রজাতির গাছপালা। মার্চ থেকে মে– এই তিন মাস এর সৌন্দর্য উপভোগ করার আসল সময়।
ছাব্বিশ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হিল ক্লাব এখানকার আকর্ষণীয় স্থাপত্যের একটি। একসময় এখানে পানশালা এবং বিলিয়ার্ড খেলার ঘর ছিল।
কিন্তু স্বাধীনতার পরে একে আবাসিক হোটেলে রূপান্তর করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় উপনিবেশের যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু এই একটি শহর যেন রয়ে গিয়েছে উপনিবেশের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য এটি হতে পারে একটি আদর্শ জায়গা। এটি এমন একটি নিরিবিলি ও শীতল জায়গা যেখানে গেলে কারো মন ভালো না হয়ে উপায় নেই। ঘরের কাছেই বিলেতের অনুভূতি পাওয়ার জন্য এ জায়গাই হতে পারে আপনার জন্য উত্তম বিকল্প।