এক সপ্তাহ পর শুরু হতে যাওয়া কাতার বিশ্বকাপে খেলবেনা বাংলাদেশের ফুটবল দল। তবুও এবারের আয়োজনে মাঠ থেকে মাঠের বাইরে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন না কোনভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম।
স্টেডিয়াম নির্মান থেকে শুরু করে অফিসিয়ালদের পরিহিত টি-শার্ট, রেফারিদের সমন্বয় করা কিংবা মাঠের চিকিৎসা ব্যবস্থা, সব জায়গাতেই অবদান থাকবে প্রবাসী বাংলাদেশীদের।
গত ১০ বছরে "গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ" খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য অভাবনীয় সব প্রকল্প হাতে নিয়েছে কাতার। সব মিলিয়ে এবারের আসরে মোট খরচ হচ্ছে ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্টেডিয়াম নির্মান ছাড়াও এসবের আওতায় গড়ে তোলা হয়েছে পুরো একটি নতুন শহর। যোগাযোগ এবং আবাসন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন শহরে নির্মান করা হয়েছে সু উচ্চ বিল্ডিং। যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করতে বানানো হয়েছে বিমানবন্দর। যাত্রী সেবা নিশ্চিত করতে পুরাতন সড়ক মেরামতের পাশাপাশি নতুন সড়ক তৈরি করা হয়েছে।
এমন প্রতিটি কাজের সঙ্গেই মিশে আছে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ঘাম। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনকে সফল করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তারা।
এমনকি বিশাল এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রান হারিয়েছেন হাজারের অধিক বাংলাদেশী শ্রমিক। যদিও কাতার বলছে তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
অবকাঠামো নির্মানে নিয়োজিত শ্রমিক ছাড়াও পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং বাগানের মালি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশী। তাদের অবদানে সৌন্দর্য্য মন্ডিত হয়ে উঠবে স্টেডিয়াম সহ পুরো এলাকা।
এবারের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে পাচটি শহরের মোট আটটি মাঠে। গর্বের বিষয় হলো, এসব ভেন্যুতে কাজ করার সময় ফিফার অফিসিয়ালদের গায়ে থাকবে "মেড ইন বাংলাদেশ" লেখা টি- শার্ট।
ফুটবল ভক্তদের গায়েও দেখা যাবে আমাদের দেশে তৈরি এসব কাপড়। কারন কাতার বিশ্বকাপের জন্য ৬ লাখ পিস অফিসিয়াল টি-শার্ট তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে।
প্রায় ১৩ কোটি টাকা রপ্তানিমূল্যের কাপড় প্রস্তুত করে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে সনেট টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। পোশাক খাতে সক্ষমতা প্রমানের পাশাপাশি এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।
এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রতিষ্ঠানটি শার্ট এবং জ্যাকেট তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ইউরো কাপেও একই রকম পন্যের অর্ডার পেয়েছিল তারা।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল আসরে খেলোয়াড়দের সুস্থ রাখার ক্ষেত্রেও থাকবে বাংলাদেশীদের অবদান। তাদের চিকিৎসা সেবার জন্য নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশি নারী ডাক্তার আয়শা পারভিন।
ফেলোর মেডিক্যাল টিমের দায়িত্বে থাকার কথা রয়েছে তার। প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কার্যক্রম দেখে আশা করা হচ্ছে ৯৭৪ স্টেডিয়ামে কাজ করবেন তিনি।
এর আগে একই ভেন্যুতে ফিফা আরব কাপে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করা এই চিকিৎসকের।
বিশ্বকাপের ম্যাচ অফিসিয়ালদের সাথেও সরাসরি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ- খ্যাত আয়োজনে ম্যাচ পরিচালনায় নিযুক্ত রেফারিদের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করবেন আমাদের দেশেরই একজন।
৩৬ জন রেফারি, ৬৯ জন সহকারী রেফারি ও ২৪ জন ভিডিও ম্যাচ অফিসিয়ালদের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবেন চট্টগ্রামের শিয়াকত আলী।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে একমাত্র বাংলাদেশি রেফারি কো-অর্ডিনেটর তিনি।
তার জন্ম ও বেড়ে উঠা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগরে। ২০১৩ সালে কাজের সূত্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে। সেখানে বার্সেলোনার একটি রেফারি অন্বেষণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বদলে যায় তার ভাগ্যের চাকা।
রেফারিং এর উপর প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপাশি কয়েকটি ডিগ্রিও অর্জন করেছেন তিনি। কাতার ফুটবল এসোসিয়েশনে সহকারী রেফারি হিসেবে কাজ করা অবস্থাতেই মিলেছে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ।
এ কাজে যুক্ত হতে পেরে বেশ খুশি হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে জানিয়েছেন নিজের গর্বের কথা। একই সাথে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন চট্টগ্রামের ছেলে শিয়াকত আলী।
নিজ দেশের এত মানুষ সরাসরি যুক্ত থাকায় ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে কাতারের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে।
গ্যালারিতে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখতে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তারা। অপরদিকে লাল সবুজের নামের সম্পৃক্ততা আছে বলে গর্ববোধ করছেন দেশ কিংবা দেশের বাইরে থাকা সকল বাংলাদেশী।